ডলারের বিপরীতে রুপির রেকর্ড পতন, ১০০ ছুঁয়ে ফেলার আশঙ্কায় কাঁপছে বাজার

ডলারের বিপরীতে রুপির রেকর্ড পতন, ১০০ ছুঁয়ে ফেলার আশঙ্কায় কাঁপছে বাজার

ভারতীয় মুদ্রাবাজারে গত এক দশকের মধ্যে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (আরবিআই) একটি কড়া নির্দেশের পর বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের বাজারে কার্যত ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ফরমান অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলোকে তাদের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ ‘আর্বিট্রাজ ট্রেড’ বা মুদ্রার দামের পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে করা মুনাফার লেনদেন দ্রুত গুটিয়ে ফেলতে হবে। এই নির্দেশের প্রভাবে সোমবার লেনদেনের শুরুতেই ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দামে রেকর্ড পতন লক্ষ করা গেছে।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাঙ্কগুলি প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি মূল্যের আর্বিট্রাজ ট্রেডে লিপ্ত ছিল। টাকার ক্রমাগত পতনের ওপর বাজি ধরে মুনাফা করার এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতেই আরবিআই এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নির্দেশের পর ইতিমধ্যেই ৪ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের ট্রেড বন্ধ করতে ব্যাঙ্কগুলোর মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে। এর ফলে বাজারে ডলারের তীব্র চাহিদা তৈরি হয়েছে এবং রুপির মান হুড়মুড়িয়ে নেমে গেছে।

সোমবার বাজার খোলার পর দেখা যায় চরম তারল্য সংকট। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার দাম দ্রুত হ্রাস পেয়ে ৯৪.৮০-এর স্তরে পৌঁছে যায়। ২০১৩ সালের পর মুদ্রাবাজারে এমন টালমাটাল পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁরা সতর্ক করছেন যে, এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে অদূর ভবিষ্যতে ডলার প্রতি রুপির দাম ১০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলা এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। এই আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, আরবিআই আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে সমস্ত নির্দিষ্ট ট্রেড বন্ধ করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে এবং ব্যাঙ্কগুলোর আবেদন সত্ত্বেও তারা সিদ্ধান্তে অনড়। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমেই বাড়ছে, যার চাপ পড়ছে ভারতের আমদানির ওপর। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার শক্তিশালী হওয়ায় বিদেশি লগ্নিকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে ক্রমাগত পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন।

টাকার এই রেকর্ড পতনের সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে। বিদেশ থেকে আমদানি করা ইলেকট্রনিক্স পণ্য যেমন ল্যাপটপ ও মোবাইলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া ডলারের দাম বাড়লে তেল আমদানির খরচ বাড়বে, যার ফলে পেট্রোল-ডিজেল ও ভোজ্য তেলের দাম বাড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। যারা বিদেশে পড়াশোনা করছেন বা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের খরচও এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাবে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে রুপির স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হলেও, স্বল্পমেয়াদে তা বাজারে অস্থিরতা ও হাহাকার সৃষ্টি করেছে। আগামী ১০ এপ্রিলের ডেডলাইনের মধ্যে ব্যাঙ্কগুলো কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ ডলারের লেনদেন সামাল দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ভারতীয় মুদ্রার ভবিষ্যৎ গতিপথ। আপাতত বিনিয়োগকারী থেকে সাধারণ মানুষ—সবার চোখ এখন বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির দিকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *