ডাব্লুটিও-তে চিনের আইএফডি প্রস্তাবের কড়া বিরোধিতায় ভারত একা লড়লেও অনড় পীযূষ গোয়েল

ডাব্লুটিও-তে চিনের আইএফডি প্রস্তাবের কড়া বিরোধিতায় ভারত একা লড়লেও অনড় পীযূষ গোয়েল

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লুটিও) সাম্প্রতিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চিনের সমর্থনে আনা ইনভেস্টমেন্ট ফেসিলিটেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (আইএফডি) চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে ভারত নিজের অনড় অবস্থান স্পষ্ট করল। ক্যামেরুনের ইয়াউন্ডেতে আয়োজিত চতুর্দশ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ভারত বাদে প্রায় প্রতিটি সদস্য দেশ এই চুক্তির পক্ষে সওয়াল করলেও, নয়াদিল্লি তার আদর্শগত অবস্থানে অটল ছিল। ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই প্রসঙ্গে সাফ জানিয়েছেন যে, ভিড়ের অংশ হয়ে ভালো সাজার চেয়ে ন্যায়ের পক্ষে একা দাঁড়িয়ে থাকা অনেক বেশি সম্মানের। ভারতের এই অনমনীয় মনোভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

২০১৭ সালে চিন এবং চিনা বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলি বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসার মানদণ্ড নির্ধারণের লক্ষ্যে এই আইএফডি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ভারতের অভিযোগ, এই চুক্তিটি ডাব্লুটিও-র বহুপাক্ষিক কাঠামোর বিরোধী। বিশেষ করে একে ‘অ্যানেক্স ৪’ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টার বিরোধিতা করেছে ভারত। উল্লেখ্য, এই বিশেষ ধারায় আসা চুক্তিগুলি সমস্ত সদস্য দেশের ওপর বাধ্যতামূলক হয় না, কেবল স্বাক্ষরকারী দেশগুলির ওপর কার্যকর হয়। ভারত মনে করে, এ জাতীয় পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং সর্বসম্মতি ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে।

পিযূষ গোয়েল জানিয়েছেন, ডাব্লুটিও-র মূল কাঠামোর বাইরে থাকা কোনো বিষয়কে এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। চিনা আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টাকে রুখে দিয়ে ভারত অন্যান্য সদস্য দেশগুলির কাছে নিজের যুক্তিনিষ্ঠ ব্যাখ্যা পেশ করেছে। ভারতের এই কড়া পদক্ষেপের ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি। বরং অনেক দেশই ভারতের এই অবস্থানকে এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করছে। ভারতের মূল দাবি হলো, বিনিয়োগকে বাণিজ্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করতে হবে যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলি সঠিক সুবিধা পায়।

বৈঠকে ই-কমার্স পণ্যের ওপর সীমা শুল্ক ছাড় বা মোরাটোরিয়াম নিয়েও ভারতের অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ভারত চায় এই ছাড়ের মেয়াদ ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে নির্ধারিত হোক। যদিও এই বিষয়ে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি, তবে ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় অবিচল রয়েছে। মন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচনায় ভারতের স্পষ্ট বার্তা ছিল যে, স্বচ্ছতা ও সুরক্ষাকবচ ছাড়া কোনো বহুপাক্ষিক চুক্তি গ্রহণ করা সম্ভব নয়। ভারত আশা করছে জেনেভায় পরবর্তী বৈঠকে এই অমীমাংসিত বিষয়গুলির একটি স্থায়ী সমাধান সূত্র পাওয়া যেতে পারে।

খাদ্য সুরক্ষা ও জনস্বার্থ রক্ষায় পাবলিক স্টকহোল্ডিং এবং ই-কমার্সের মতো বিষয়গুলিতে ভারত দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। পীযূষ গোয়েল মনে করেন, এই অগ্রগতি কিছুটা ধীর হলেও এটি ভারতের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক স্তরে ভারত একা লড়লেও নিজের অধিকার এবং ন্যায়ের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না, ডাব্লুটিও-র এই মঞ্চ থেকে সেই বার্তাই গোটা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিল নয়াদিল্লি। এসইও-র নিরিখে ভারতের এই কূটনৈতিক জয় বাণিজ্যের বিশ্বায়নে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *