নির্বাচনী হিংসায় রক্তাক্ত বাংলা, দেশের মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি এ রাজ্যেই

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন মানেই কি অবধারিত রক্তপাত? ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতেই ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এই প্রশ্ন। নির্বাচন ঘোষণার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই শাসকদলের এক বুথ সভাপতির খুনের ঘটনা নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, দলীয় কোন্দলের জেরেই এই প্রাণহানি। তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, হিংসা ও লুটপাট ছাড়া কি বাংলায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট সম্ভব নয়?
আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট’ (ACLED)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। গত ছয় বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের অন্যান্য যে কোনো রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গেই নির্বাচনী হিংসার ঘটনা সবথেকে বেশি। ২০২০ সাল থেকে দেশে ঘটা মোট সহিংসতার ৩৫ শতাংশ এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রাণহানির ৫১ শতাংশই ঘটেছে এই রাজ্যে। অর্থাৎ, গোটা দেশে ভোটে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার অর্ধেকই বাংলার।
রেকর্ড বলছে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ছিল বাংলার ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। সেই বছর ৩০০টি হিংসার ঘটনায় ৫৮ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এর বিপরীতে বড় রাজ্য হিসেবে পরিচিত উত্তরপ্রদেশ বা মহারাষ্ট্রে হিংসার হার ছিল অত্যন্ত নগণ্য। ২০২১ সালের আট দফার নির্বাচনে এপ্রিল মাস ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। শুধুমাত্র ওই মাসেই ১২৩টি সহিংসতার ঘটনা এবং ১৯ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছিল। ফল ঘোষণার পর মে মাসেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, এই দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একে অপরের দিকে আঙুল তুলেছে। ACLED-এর নথিবদ্ধ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সাল থেকে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনায় শাসকদলের নাম জড়ালেও বিরোধী দলগুলিও সহিংসতার দায় এড়াতে পারে না। সম্পত্তি ধ্বংস ও বুথ দখলের মতো অভিযোগও বারবার উঠে এসেছে। বড় রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রতি আসনে সহিংসতার হারেও পশ্চিমবঙ্গ শীর্ষস্থানে রয়েছে।
২০২৬ সালের বর্তমান নির্বাচনী পরিক্রমাতেও আশঙ্কার মেঘ কাটেনি। তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাস শেষ হওয়ার আগেই রাজ্যে অন্তত ৪০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে গিয়েছে। ২০২১ সালের প্রাক-নির্বাচনী পর্বেও একই ধারা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। যদিও এ বছর এখনও বড় কোনো প্রাণহানি হয়নি, তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা সাধারণ ভোটারদের মনে দুশ্চিন্তা জিইয়ে রেখেছে। গণতান্ত্রিক উৎসবে বারবার রক্তের দাগ কেন লাগবে, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।