নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় বার্তা দিলেন বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন

ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ স্তরের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যদি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রার্থীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তবে সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা আসাম্ভব। তাঁর মতে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কমিশনের পরিকাঠামোগত স্বাধীনতা অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি পাটনার চাণক্য ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি আয়োজিত রাজেন্দ্র প্রসাদ স্মৃতি বক্তৃতায় অংশ নিয়ে এই মন্তব্য করেন বিচারপতি নাগরত্ন। তিনি সাফ জানান, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নির্বাচন কমিশন হলো প্রধান চালিকাশক্তি। ১৯৯৫ সালের শীর্ষ আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্ব অপরিসীম এবং একে কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হতে দেওয়া উচিত নয়।
বক্তৃতায় বিচারপতি আরও বলেন যে, নির্বাচন কেবল নির্দিষ্ট সময় অন্তর ঘটে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সরকার গঠিত হয় এবং ক্ষমতার রূপান্তর ঘটে। এই প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা মানে পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার শর্তাবলির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা। তাই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, তাঁদের সব ধরণের পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থাকা প্রয়োজন।
সংবিধানের তিন প্রধান স্তম্ভ— আইনসভা, প্রশাসন ও বিচারবিভাগের বাইরেও কিছু ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ সদৃশ প্রতিষ্ঠান থাকে যা গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখে। নির্বাচন কমিশন, পাবলিক ফিন্যান্স এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি এই তালিকায় পড়ে। বিচারপতি নাগরত্ন মনে করেন, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এই প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। এগুলি সরাসরি তিন স্তম্ভের অংশ না হলেও সাংবিধানিক শৃঙ্খলা রক্ষায় এদের ভূমিকা অপরিহার্য।
কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের বিষয়ে আলোকপাত করে বিচারপতি আবেদন জানান যে, সুশাসনের স্বার্থे দলগত বিভেদ ভুলে কাজ করা উচিত। তাঁর মতে, কেন্দ্রে কোন দল ক্ষমতায় আছে বা রাজ্যে কাদের শাসন চলছে, তার ওপর ভিত্তি করে শাসন ব্যবস্থা নির্ধারিত হওয়া কাম্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়ই হলো সফল গণতন্ত্রের মূল চাবিকাঠি।
পরিশেষে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্র সময়ের সাথে সাথে এটা প্রমাণ করেছে যে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার পরিবর্তন ও স্থিতিশীলতা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই গৌরবময় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে নির্বাচন কমিশনকে যেকোনো প্রকার ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের মর্যাদা অটুট থাকে।