নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে গাজা শান্তি পরিকল্পনায় সায় মোদির, ‘পারিবারিক বন্ধুত্ব’ নাকি কূটনৈতিক ডিগবাজি?

নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে গাজা শান্তি পরিকল্পনায় সায় মোদির, ‘পারিবারিক বন্ধুত্ব’ নাকি কূটনৈতিক ডিগবাজি?

জেরুজালেম ও নয়াদিল্লি: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ইতিহাস আর কূটনীতির এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ইজরায়েলের মাটিতে দাঁড়িয়ে একদিকে যখন তিনি নাৎসি অত্যাচারের স্মারক ‘ইয়াদ ভাশেম’ মিউজিয়ামে ইহুদি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন, অন্যদিকে তখন দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে শুরু হয়েছে তীব্র সংঘাত। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মোদির এই সফর এবং গাজা ইস্যুতে তাঁর সাম্প্রতিক অবস্থানকে ঘিরে ভারতের দীর্ঘদিনের বিদেশনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলল বিরোধী শিবির।

কেনেসেটে মোদির ভাষণ এবং নেতানিয়াহুর ‘চোখের জল’

বৃহস্পতিবার ইজরায়েলি পার্লামেন্ট ‘কেনেসেট’-এ দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি যে ভাষণ দিয়েছেন, তাকে ঐতিহাসিক এবং আবেগময় বলে বর্ণনা করেছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহুর দাবি, মোদির শব্দচয়ন ইজরায়েলের প্রতিটি নাগরিকের চোখে জল এনে দিয়েছে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মোদি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইজরায়েলের প্রস্তাবিত ‘গাজা শান্তি পরিকল্পনা’র মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানো সম্ভব। তিনি আরও যোগ করেন, “মানবতাকে কোনোভাবেই সংঘাতের বলি হতে দেওয়া যাবে না।” দুই রাষ্ট্রপ্রধানের এই বৈঠকে প্রতিরক্ষা, উচ্চপ্রযুক্তি, কৃষি এবং স্টার্ট-আপ ক্ষেত্রে একগুচ্ছ নতুন চুক্তির রূপরেখা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভারত-পশ্চিম এশিয়া-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর (IMEC) এবং I2U2 গোষ্ঠীর সক্রিয়তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে যা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি বদলে দিতে পারে।

কংগ্রেসের তোপ: নেহরুর আদর্শ বনাম মোদির ‘নির্লজ্জ সাফাই’

প্রধানমন্ত্রীর এই ইজরায়েল সফরকে কেন্দ্র করে ঘরোয়া রাজনীতিতে পারদ চড়িয়েছে কংগ্রেস। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে জানিয়েছেন, গাজা সংকট নিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের অবস্থানকে যেভাবে মোদি সমর্থন করেছেন, তাতে ভারতের আন্তর্জাতিক ‘নৈতিক অবস্থান’ লঘু হয়েছে।

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ১৯৪৭ সালে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে লেখা জওহরলাল নেহরুর একটি চিঠির প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়। রমেশ বলেন, “নেহরু স্পষ্ট বলেছিলেন ইহুদিদের প্রতি যেমন সমবেদনা রয়েছে, আরবদের দুর্দশা নিয়েও ভারতের সমান উদ্বেগ আছে। কিন্তু মোদি আজ সেই ভারসাম্যের নীতি বিসর্জন দিয়ে একতরফাভাবে নেতানিয়াহুর হয়ে সাফাই গাইছেন।” বিরোধীদের দাবি, ভারত বরাবরই প্যালেস্তাইন ইস্যুতে ভারসাম্য বজায় রেখে এসেছে, যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লঙ্ঘন করছেন।

প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত

রাজনৈতিক বাদানুবাদ থাকলেও, এই সফরের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। সেখানে শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং সাইবার প্রযুক্তিতে দুই দেশের যৌথ পথচলার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে ইজরায়েলি প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং ভারতীয় স্টার্ট-আপগুলোর জন্য ইজরায়েলের বাজার উন্মুক্ত করার বিষয়ে বড়সড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মোদির এই সফর শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দৃঢ় করা নয়, বরং ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের আবহে ভারতের নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত করার এক সুনিপুণ চাল। তবে গাজা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে ভারতের এই প্রকাশ্য সমর্থন আন্তর্জাতিক মহলে নয়াদিল্লির ভূমিকাকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *