পুতিনের মাস্টারস্ট্রোক! গ্যাসের দামে ৪০% ছাড় দিচ্ছে রাশিয়া, ভারত কি কিনবে?

ইউক্রেন ও ইরান পরিস্থিতির জটিল সমীকরণের মাঝে বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি সংকট চরমে, তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজের দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বড় ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছেন। তেলের বাজারে বিপুল মুনাফার পর এবার এশীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে এলএনজি (LNG) বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসে বিশাল ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে মস্কো। বিশেষ করে ভারতসহ এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোকে নিজেদের কবজায় নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ক্রেমলিন।
গ্যাসের বাজারে রাশিয়ার ৪০ শতাংশ ছাড়ের নেপথ্যে
বর্তমানে লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। কাতারের এলএনজি প্ল্যান্টে হামলার কারণে বিশ্ববাজারে গ্যাসের সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে, যার ফলে দাম আকাশচুম্বী। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে রাশিয়া তাদের ‘আর্কটিক এলএনজি ২’ (Arctic LNG 2) প্রকল্পের গ্যাসে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকার আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তাদের নতুন প্ল্যান্টের গ্যাস বিক্রির জন্য বিকল্প বাজার তৈরি করা।
ভারত ও এশীয় দেশগুলোর সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেনিস মান্টুরভ সম্প্রতি ভারত সফরকালে বড় আকারের তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দেন। তবে রাশিয়ার এই সস্তা গ্যাসের প্রস্তাব গ্রহণ করা ভারতের জন্য সহজ নয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: রাশিয়ার নির্দিষ্ট কিছু গ্যাস প্রকল্পের ওপর আমেরিকার কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই গ্যাস কিনলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
- সতর্ক কূটনীতি: ভারত বরাবরই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেয়। যদিও সম্প্রতি তেলের ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ওঠায় ইরান থেকে তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত, তবে গ্যাসের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন।
- বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা: নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প ও নিরাপদ উৎসের ওপর নির্ভর করতে চাইছে অধিকাংশ দেশ।
চীনের কৌশল ও ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ব্যবহার
রাশিয়া থেকে সস্তা গ্যাস নিতে চীন অত্যন্ত চতুর কৌশল অবলম্বন করছে। তারা ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া জাহাজ বহরের মাধ্যমে এই গ্যাস সংগ্রহ করছে। বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কাগজে-কলমে দেখানো হচ্ছে যে, এই গ্যাস ওমান বা নাইজেরিয়া থেকে আসছে। এভাবে নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চীন রাশিয়ার সস্তা জ্বালানির পূর্ণ সুবিধা নিচ্ছে।
যুদ্ধের মাঝে রাশিয়ার তেলের বাজার থেকে আকাশচুম্বী আয়
জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম রাশিয়ার কোষাগারকে অভাবনীয়ভাবে সমৃদ্ধ করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে রাশিয়ার তেল খাত থেকে আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মার্চ মাসে তেল থেকে রাশিয়ার আয় ছিল ৩২৭ বিলিয়ন রুবল, যা এপ্রিলে বেড়ে ৭০০ বিলিয়ন রুবল বা প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকা এবং বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম পুতিনের জন্য শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একঝলকে
- রাশিয়া তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসে (LNG) ৪০ শতাংশ ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে।
- ভারতসহ এশীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে এই বিশাল ডিসকাউন্ট দেওয়া হচ্ছে।
- আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই গ্যাস কেনা ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
- চীন ছদ্মবেশে ওমান বা নাইজেরিয়ার নাম ব্যবহার করে রাশিয়ার সস্তা গ্যাস কিনছে।
- ২০২৬ সালের এপ্রিলে রাশিয়ার তেল খাতের আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলারে।
- বিশ্বের ২০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাশিয়ার এই প্রস্তাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।