পুরুষদের ঢোকা মানা! সুপ্রিম কোর্টে ভারতের এমন ৭ মন্দিরের তালিকা দিল কেন্দ্র

শবরীমালা মন্দিরে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলছে। এই মামলার শুনানিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি চাঞ্চল্যকর ও গভীর বিশ্লেষণধর্মী অবস্থান তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রের দাবি, হিন্দুধর্মে নারীদের কেবল পুরুষের সমান নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চতর মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছে। লিঙ্গবৈষম্য নয়, বরং ধর্মীয় বিশ্বাস ও দীর্ঘদিনের আচারের অংশ হিসেবেই নির্দিষ্ট কিছু মন্দিরে পুরুষদের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংবিধানিক যুক্তি
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা ৯ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চের কাছে যুক্তি দেন যে, হিন্দুধর্ম প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই ‘নারীশক্তি’র আরাধনা করে আসছে। তিনি বলেন, শবরীমালা রায়ের ক্ষেত্রে এই ধারণা কাজ করেছিল যে পুরুষরাই শ্রেষ্ঠ, কিন্তু হিন্দুধর্মের সামগ্রিক ঐতিহ্যে এর কোনো প্রতিফলন নেই। কেন্দ্রের মতে, সংবিধানের ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদের অধীনে পাওয়া ধর্মীয় অধিকারগুলোকে সবসময় ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের (সাম্যের অধিকার) কঠোর কষ্টিপাথরে বিচার করা সম্ভব নয়। এখানে বিশ্বাসের প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ভারতের সেই সাত মন্দির যেখানে পুরুষদের জন্য রয়েছে কড়া নিয়ম
তুষার মেহতা দেশের এমন সাতটি মন্দিরের উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে বিশেষ বিশেষ সময়ে বা স্থায়ীভাবে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ বা সীমিত:
- আত্তুকাল ভগবতী মন্দির (কেরল): এখানে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নারীদের বিশ্বের বৃহত্তম সমাগম ঘটে। পোঙ্গল উৎসবের প্রধান দিনে পুরুষদের প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকে।
- চাক্কুলাথুকভু মন্দির (কেরল): এখানে ‘নারী পূজা’র সময় পুরুষ পুরোহিতরা নারী ভক্তদের পা ধুইয়ে দেন। এই বিশেষ সময়ে কেবল নারীরাই মন্দিরে থাকতে পারেন।
- ব্রহ্মা মন্দির (পুষ্কর): পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, বিবাহিত পুরুষরা এই মন্দিরে পূজা করলে তাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি আসতে পারে। তাই গর্ভগৃহে বিবাহিত পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ।
- ভগবতী আম্মান মন্দির (কন্যাকুমারী): দেবী এখানে ‘সন্ন্যাসী’ রূপে বিরাজমান। তাই অবিবাহিত পুরুষরা গেট পর্যন্ত যেতে পারলেও বিবাহিত পুরুষদের মন্দিরের ভেতরে ঢোকা বারণ।
- মাতা মন্দির (মুজাফফরপুর): বিহারের এই মন্দিরে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পুরুষদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি পুরুষ পুরোহিতরাও তখন মন্দিরে ঢুকতে পারেন না।
- কোট্টানকুলাঙ্গারা শ্রী দেবী মন্দির (কেরল): এই মন্দিরের ঐতিহ্য বেশ অদ্ভুত। এখানে দেবীর আশীর্বাদ পেতে পুরুষদের নারী সেজে বা নারীর পোশাক পরে আসতে হয়।
- কামাখ্যা মন্দির (আসাম): অম্বুবাচী চলাকালীন দেবীর ঋতুচক্রের সময় পুরুষদের প্রবেশ বন্ধ থাকে। এই সময়ে সমস্ত সেবাকার্য কেবল নারী পুরোহিতরাই পরিচালনা করেন।
প্রভাব ও বিশ্লেষণ
কেন্দ্রের এই যুক্তির মূল লক্ষ্য হলো এটি প্রমাণ করা যে, মন্দিরে প্রবেশের বিধিনিষেধ কেবল নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষদের ওপরও প্রযোজ্য। এটি কোনো লিঙ্গবৈষম্যমূলক মানসিকতা থেকে নয়, বরং মন্দিরের অধিষ্ঠিত দেবতার স্বরূপ ও প্রাচীন প্রথার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই মামলাটি ভারতের বিচারব্যবস্থার সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে— যেখানে একদিকে আধুনিক সাংবিধানিক অধিকার এবং অন্যদিকে হাজার বছরের প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাসের ভারসাম্য রক্ষা করার প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে।
একঝলকে
- মামলা: শবরীমালা মন্দিরে নারী প্রবেশ সংক্রান্ত শুনানি।
- কেন্দ্রের অবস্থান: হিন্দুধর্মে নারীশক্তিকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
- প্রধান যুক্তি: লিঙ্গভিত্তিক বিধিনিষেধ সবসময় বৈষম্য নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা ধর্মীয় বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
- উদাহরণ: পুষ্কর, কামাখ্যা ও কেরলের বিভিন্ন মন্দিরে পুরুষদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
- আইনি লড়াই: সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ বনাম অনুচ্ছেদ ২৫ ও ২৬-এর অধিকার নিয়ে বিতর্ক।