বাঙালির আবেগে শানিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় বাংলা স্লোগানের অজানা ইতিহাস

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে জলহাটির জনসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তুলে ধরলেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রেক্ষাপট। ব্যারাকপুর এবং শিল্পাঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কীভাবে এই শব্দবন্ধটি তৃণমূল নেত্রীর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠল, তা আজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ব্যারাকপুর ও বীজপুরের সেই উত্তাল দিনগুলো
২০২১ সালের ভোটের ফল প্রকাশের পর ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। জগদ্দল, কাঁচরাপাড়া ও বীজপুর এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার খবর পেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সেখানে পৌঁছান, পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। তৃণমূল নেত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় বিরোধীদের পক্ষ থেকে তাকে লক্ষ্য করে অশ্রাব্য কটূক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু পালটা কোনও গালি বা আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার না করে তিনি কেবল উচ্চারণ করেছিলেন— ‘জয় বাংলা’। এই স্লোগানটিই ছিল তাঁর কাছে অহঙ্কার ও প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠ ভাষা।
স্লোগানের নেপথ্যে থাকা ইতিহাস ও শক্তি
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া এই স্লোগানটির শিকড় লুকিয়ে আছে ওপার বাংলার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান চালিকাশক্তি। ইতিহাসবিদদের মতে:
- উৎপত্তি: ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক ছাত্রসভা থেকে প্রথম এই স্লোগানের জন্ম হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
- প্রচার: ১৯৭০ সালে রেসকোর্স ময়দানের সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবার জনসমক্ষে ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করেন।
- মুক্তির মন্ত্র: ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের শেষে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের এই উচ্চারণ স্লোগানটিকে বাঙালির জাতীয় মন্ত্রে পরিণত করে।
- বেতার তরঙ্গ: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সিগনেচার টিউন হিসেবে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি ব্যবহৃত হতো, যা যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের মনোবল বাড়িয়ে দিত।
আধুনিক রাজনীতিতে বাঙালি অস্মিতা
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘বাঙালি অস্মিতা’ বা বাঙালির আত্মপরিচয়কে তুলে ধরতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার এই স্লোগানটি ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে বিজেপির আগ্রাসী রাজনীতির মোকাবিলা করতে তিনি হিন্দুস্তানি ভাবধারার বিপরীতে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষার জয়গান গেয়েছেন। জলহাটির সভা থেকে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, জয় বাংলা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি বাঙালির অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের নাম।