ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরই’ এখন সর্বনাশা ভুল ইরানের

ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরই’ এখন সর্বনাশা ভুল ইরানের

ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে মাটির নিচে ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্র নগর গড়ে তুলেছিল ইরান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর সেই কৌশলই এখন তেহরানের জন্য বড় ধরনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

মাটির নিচে গড়ে তোলা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এসব স্থাপনা শত্রুপক্ষের হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে এই কৌশল এখন ইরানের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

সংবাদ মাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের এই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান ও সশস্ত্র ড্রোনগুলো ইরানের মাটির নিচের কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ওপর নজরদারি চালাচ্ছে। ঘাঁটি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী লাঞ্চার বের হওয়া মাত্র সেগুলোর ওপর হামলা চালানো হচ্ছে।

এর ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের হার কমে গেছে। পাশাপাশি মাটির নিচের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ভারি বোমা হামলাও চালানো হচ্ছে।

এসব হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারের প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক অস্ত্র মাটির নিচেই আটকা পড়ে থাকছে। সম্প্রতি স্যাটেলাইটে তোলা কয়েকটি ছবিতে ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির প্রবেশপথে ধ্বংসাবশেষও দেখা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার প্রবেশপথে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও লাঞ্চার ধ্বংস হয়েছে।

এই ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের মধ্যে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিরাজ নগরীর কাছে কয়েকটি ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে একাধিক দফায় হামলা হয়েছে। এছাড়া ইসফাহান, তাবরিজ এবং কেরমানশাহ নগরীর কাছেও এমন ঘাঁটি রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুদ্ধে ইরানের যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই ভূগর্ভস্থ। যদিও এসব ঘাঁটির ওপরে ভবন, প্রবেশপথ ও সড়ক থাকায় স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

ইরানের বিভিন্ন পার্বত্য এলাকায় মাটির গভীরে সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে। এসব ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় শাহাব-৩, ঘাদর-এইচ, ইমাদ, খেইবার শেকান এবং সেজ্জিলের মতো দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চে ইরান তাদের সবচেয়ে বড় ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল, যা দেশটির ‘লৌহ মুষ্ঠি’ হিসেবে পরিচিত। তবে ওই ঘাঁটির অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। ভিডিওতে দেখা যায়, জানালাবিহীন দীর্ঘ করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি কমান্ডার এবং সেখানে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী বহু ট্রাক সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান ৫০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক সিএনএ করপোরেশনের গবেষণা বিশ্লেষক ডেকার ইভেলেথ জানিয়েছেন, ইরান এখন মাটির নিচের বাঙ্কার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কৌশল অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কমে যাওয়া থেকে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার কারণে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা কমছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কমান্ডার ব্র্যাড কুপার বলেছেন, ইরানের হাতে থাকা অবশিষ্ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চারগুলো ধ্বংস করার জন্য তারা খোঁজ চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধবিমান অভিযানের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হার চার দিনের মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশ কমে গেছে।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *