ভোটের কালির রহস্য, আঙুলের দাগ সহজে ওঠে না কেন

গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হয়ে ভোট দেওয়ার পর আঙুলের ডগায় কালির দাগ এখন এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। ভোট দিয়ে বেরিয়ে সেই দাগ দেখিয়ে সেলফি তোলা এক ট্রেন্ডে পরিণত হলেও, অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে কেন এই বিশেষ কালি সহজে মুছে ফেলা যায় না। মূলত নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে এবং জাল ভোট বা একই ব্যক্তির একাধিকবার ভোট দেওয়া রুখতে এই পদ্ধতির প্রচলন। ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় এই কালির গুরুত্ব অপরিসীম।
এই কালির নেপথ্যে রয়েছে বিশেষ রাসায়নিক বিজ্ঞান। এর প্রধান উপাদান হলো সিলভার নাইট্রেট (Silver Nitrate)। যখন এই কালি আঙুলের ত্বকে লাগানো হয়, তখন এটি শরীরের ঘাম ও ত্বকের প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সিলভার ক্লোরাইড তৈরি করে। এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে এমন এক গাঢ় বেগুনি বা কালো দাগ তৈরি হয়, যা সাধারণ সাবান, জল বা কোনও রাসায়নিক দিয়ে তোলা আসাম্ভব। একমাত্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের মৃত কোষ ঝরে পড়লেই এই দাগ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
ভারতে এই বিশেষ কালির ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৬২ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রথমবার এই ‘ইন্ডেলিবল ইঙ্ক’ বা মোচনাতীত কালি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। কর্ণাটকের মাইসুরুতে অবস্থিত ‘মাইসুরু পেইন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড’ এই কালি প্রস্তুতকারী একমাত্র অনুমোদিত সংস্থা। শুধুমাত্র ভারতেই নয়, বিশ্বের বহু দেশেই বর্তমানে এই কালি রফতানি করা হয়। সুরক্ষার খাতিরে এই কালি তৈরির মূল ফর্মুলা অত্যন্ত গোপন রাখা হয় এবং প্রতিটি বোতল কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কমিশনকে সরবরাহ করা হয়।
ডিজিটাল ইন্ডিয়া বা বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের যুগেও এই কালির কদর কমেনি। এটি একইসঙ্গে প্রযুক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা প্রদান করে। আঙুলে কালির দাগ থাকলে সহজেই শনাক্ত করা যায় কে ভোট দিয়েছেন আর কে দেননি। সাধারণ ও সস্তা পদ্ধতি হওয়া সত্ত্বেও ভোট জালিয়াতি রুখতে এটি আজও বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়। এক চিমটি সিলভার নাইট্রেটের এই কারসাজিই কয়েক দশক ধরে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রেখেছে।