মধ্যপ্রাচ্যে চীনের শান্তি পরিকল্পনা ও পাকিস্তানের আমেরিকা নীতিতে নতুন মোড়

মধ্যপ্রাচ্যে চীনের শান্তি পরিকল্পনা ও পাকিস্তানের আমেরিকা নীতিতে নতুন মোড়

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার আবহে বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে নতুন কৌশল নিয়েছে চীন। বেইজিং এখন নিজেকে কেবল একটি অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং বিশ্বশান্তি রক্ষাকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরতে মরিয়া। এরই অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পাঁচ দফার একটি বিশেষ পরিকল্পনা পেশ করেছে শি জিনপিংয়ের প্রশাসন। তবে চীনের এই শান্তি উদ্যোগের সমান্তরালে পাকিস্তানের আমেরিকা-ঘনিষ্ঠতা বেইজিংয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইশাক ডার বেইজিং সফর করেন। সেখানে চীনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। চীন যখন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাত এবং ইরান সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চাইছে, ঠিক তখনই ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সম্পর্ক আরও জোরদার করছে। পাকিস্তানের এই দ্বিমুখী নীতি এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন ও পাকিস্তান দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও সামরিক মিত্র হলেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বেইজিংকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের আমেরিকা সফর এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সখ্যতা চীনকে ভাবিয়ে তুলছে। ইসলামাবাদ এখন বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ভারসাম্যের নীতি গ্রহণ করে নিজেদের আখের গোছাতে চাইছে। কিন্তু দুই মহাশক্তির লড়াইয়ের মাঝে এই ভারসাম্য রক্ষা করা পাকিস্তানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব খর্ব করতে আমেরিকা এখন পাকিস্তানকে ব্যবহারের চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের বর্ধিত সহযোগিতা বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ ও নেপালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র আধিপত্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন মনে করছে, আমেরিকার মদতেই সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে তাদের বিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে।

আফগান সীমান্তে উত্তপ্ত পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চীন চায় পাকিস্তান যেন তাদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকে, কিন্তু ইসলামাবাদ এখন সাহায্যের নতুন উৎস হিসেবে পশ্চিমী বিশ্বের দিকে ঝুঁকছে। এই টানাপোড়েনের প্রভাব সরাসরি পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর। বেইজিংয়ের শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাকিস্তান কতটা বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে সংশয় রয়েছে।

ভবিষ্যতে পাকিস্তান পুরোপুরি আমেরিকার বলয়ে চলে যাবে নাকি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তী রাজনৈতিক মানচিত্র। চীনের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা সফল করতে হলে পাকিস্তানের সক্রিয় সমর্থন প্রয়োজন। তবে ইসলামাবাদের বর্তমান গতিবিধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা নিজেদের স্বার্থে যে কোনো দিকে ঝুঁকতে প্রস্তুত। এই ত্রিভুজ সম্পর্কের টানাপোড়েন আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *