মন্দিরে মহিলা প্রবেশ কি শুধুই ধর্মীয় প্রথা নাকি লিঙ্গ বৈষম্য, সুপ্রিম কোর্টকে সংযত থাকার পরামর্শ কেন্দ্রের

মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধর্মীয় রীতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এবার কড়া অবস্থান নিল কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের শীর্ষ আদালতকে কেন্দ্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, মন্দিরের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় আচার এবং শতাব্দী প্রাচীন রীতিনীতির ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। মোদী সরকারের এই যুক্তি ঘিরে এখন দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে।
কেন্দ্রের মূল অবস্থান ও সাংবিধানিক যুক্তি
সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামায় সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকা বা বিশেষ নিয়ম মেনে চলা সম্পূর্ণভাবে সেই ধর্মের ‘অপরিহার্য ধর্মীয় প্রথা’ বা এসেনশিয়াল রিলিজিয়াস প্র্যাকটিস-এর অন্তর্ভুক্ত। কেন্দ্রের যুক্তিগুলো হলো:
- ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার: সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজের ধর্ম পালনের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, বিচার বিভাগীয় অতি-সক্রিয়তা তাতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
- আস্থার প্রশ্ন: ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তির ঊর্ধ্বে থাকে। তাই সবক্ষেত্রে আধুনিক আইনি কাঠামো বা যুক্তি দিয়ে ধর্মীয় আবেগকে বিচার করা সম্ভব নয়।
- সামাজিক ভারসাম্য: জোর করে দীর্ঘদিনের প্রথা পরিবর্তন করলে দেশের সামাজিক ভারসাম্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও সামাজিক প্রভাব
শবরীমালা মামলা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন তীর্থস্থানে মহিলাদের প্রবেশাধিকার নিয়ে গত কয়েক বছরে একাধিক মামলা হয়েছে শীর্ষ আদালতে। আদালত যখন লিঙ্গ সাম্যের ভিত্তিতে প্রথা ভাঙার কথা বলছে, তখন রক্ষণশীল সমাজ এবং সরকার এর বিরোধিতা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদী সরকারের এই অবস্থানকে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সাধুবাদ জানালেও নারী অধিকার কর্মীরা একে ভিন্ন চোখে দেখছেন। অধিকার কর্মীদের দাবি, ধর্মের দোহাই দিয়ে লিঙ্গ বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেওয়া সরাসরি সংবিধান বিরোধী। অন্যদিকে, সরকারের মতে শতাব্দী প্রাচীন প্রথা রক্ষা করা তাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
ভবিষ্যৎ বিচারবিভাগীয় চ্যালেঞ্জ
আগামী দিনে এই সংঘাত কোন পথে হাঁটে, সেদিকেই এখন সবার নজর। সুপ্রিম কোর্ট কি কেন্দ্রের এই ‘পরামর্শ’ মেনে পিছিয়ে আসবে, নাকি সাংবিধানিক অধিকার ও লিঙ্গ সাম্যকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন কোনো যুগান্তকারী রায় দেবে? ভারতের বিচারব্যবস্থা এবং শাসনবিভাগের এই দ্বন্দ্ব এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
এক ঝলকে
- মন্দিরের অভ্যন্তরীণ প্রথায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করল কেন্দ্র।
- ধর্মীয় রীতিকে ‘অপরিহার্য প্রথা’ হিসেবে উল্লেখ করে সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের দোহাই দেওয়া হয়েছে।
- কেন্দ্রের মতে, জোর করে নিয়ম বদলালে সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে।
- নারী অধিকার কর্মীদের মতে, এই অবস্থান লিঙ্গ বৈষম্যকে উৎসাহিত করছে।
- বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন এবং পরবর্তী রায়ের ওপর নির্ভর করছে সামাজিক প্রেক্ষাপট।