মহাকাশে আধিপত্যের লড়াইয়ে চন্দ্রাভিযানে আর্টেমিস ২ মিশনের ঐতিহাসিক সূচনা

মহাকাশে আধিপত্যের লড়াইয়ে চন্দ্রাভিযানে আর্টেমিস ২ মিশনের ঐতিহাসিক সূচনা

৫০ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফের চাঁদের দেশে পাড়ি দিল মানুষ। বুধবার নাসার আর্টেমিস ২ মিশনের আওতায় ওরিয়ন ক্যাপসুলে চড়ে চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন চার মহাকাশচারী। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানববাহী মহাকাশযান চাঁদের এত কাছে পৌঁছাতে চলেছে। এই অভিযানে নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান মহাকাশ সংস্থার জেরেমি হ্যানসন শামিল রয়েছেন। প্রায় ১০ দিনের এই সফরে তারা চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

এই অভিযানের মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণায় আমেরিকা ও চিনের মধ্যে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে। উভয় দেশই চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করে সেখানকার বরফ, হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো অমূল্য খনিজ সম্পদ আহরণ করতে চায়। নাসার লক্ষ্য ২০২৮ সালের আর্টেমিস ৪ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষের অবতরণ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, ২০৩০ সালের মধ্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে মহাকাশচারী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে চিন। বর্তমানে আমেরিকা মহাকাশ প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেও, চিনের ‘মেংঝৌ’ বা ড্রিম বোট নামক নতুন মহাকাশযান তাদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর্টেমিস ২ মিশনটি কেবল বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, বরং এটি মানুষের দীর্ঘতম মহাকাশ সফরের রেকর্ড গড়তে চলেছে। মহাকাশচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লক্ষ ৬ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করবেন, যা এর আগে ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো ১৩ মিশনের রেকর্ডের চেয়েও বেশি। যাত্রাপথে মহাকাশচারীরা তাদের ব্যক্তিগত আইফোন ব্যবহার করে ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করার সুযোগ পাচ্ছেন। যদিও সুরক্ষার খাতিরে ফোনগুলো এয়ারপ্লেন মোডে থাকবে, তবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে তারা ছবি ও ইমেল পাঠাতে পারবেন।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি মহাকাশচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও বিশেষ নজর দিয়েছে নাসা। অতীতের অ্যাপোলো মিশনগুলোতে কোনো শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকলেও, ওরিয়ন ক্যাপসুলে ‘ইউনিভার্সাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ নামক উন্নত শৌচাগার স্থাপন করা হয়েছে। যদিও যাত্রার শুরুতেই কন্ট্রোলারে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, তবে নাসার প্রকৌশলীরা দ্রুত তা মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। মহাকাশের চরম প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতিযোগিতায় যে দেশ আগে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়তে পারবে, মহাকাশ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নিয়ম নির্ধারণে তাদের ভূমিকা থাকবে অগ্রগণ্য। আমেরিকা যখন স্পেস-এক্স এর মতো পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তিতে বলীয়ান, তখন চিন তাদের ‘লং মার্চ ১০’ রকেটের ওপর ভরসা রাখছে। সব মিলিয়ে আর্টেমিস ২ মিশনটি কেবল চাঁদে ফিরে যাওয়ার যাত্রা নয়, বরং মহাকাশে মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ বসতি স্থাপনের এক রোমাঞ্চকর প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *