মাতৃত্ব কি শুধুই সুখের না কি এক অদৃশ্য খাঁচা, মা হওয়ার পর কেন অনুতপ্ত অনেক নারী

মাতৃত্ব কি শুধুই সুখের না কি এক অদৃশ্য খাঁচা, মা হওয়ার পর কেন অনুতপ্ত অনেক নারী

সন্তান জন্ম দেওয়া বা মা হওয়াকে সামাজিকভাবে পরম প্রাপ্তি হিসেবে দেখা হলেও, অনেক নারীর কাছে এর অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্প্রতি বিবিসি-র এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য, যেখানে দেখা যাচ্ছে অনেক নারীই মা হওয়ার পর নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত। তাঁদের মতে, মাতৃত্ব মানেই নিজের শরীর, সময়, অর্থ এবং মানসিক শক্তির এক বিশাল বিসর্জন, যার কোনো শেষ নেই।

চল্লিশ বছর বয়সী শিক্ষিকা কারমেন (নাম পরিবর্তিত) তাঁর দশ বছরের ছেলেকে প্রচণ্ড ভালোবাসলেও অকপটে স্বীকার করেছেন যে, সময়কে পেছনে ফেরানো গেলে তিনি হয়তো কখনোই মা হতেন না। কারমেনের মতো হাজার হাজার নারী বর্তমানে সমাজ ও পরিবারের ভয়ে নিজেদের এই গোপন অনুশোচনা লুকিয়ে রাখছেন। অনলাইনে ‘আই রিগ্রেট হ্যাভিং চিলড্রেন’ নামক বিভিন্ন গ্রুপে এখন লক্ষাধিক সদস্য, যেখানে মায়েরা তাঁদের মনের না বলা যন্ত্রণার কথা ভাগ করে নিচ্ছেন।

মনোবিদ অনা মাথুর এবং সমাজবিজ্ঞানী ওর্না ডোনাথের গবেষণায় দেখা গেছে, মা হওয়ার পর অনুতপ্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁরা সন্তানকে ভালোবাসেন না। বরং মাতৃত্বের সঙ্গে আসা একাকীত্ব, পরিচয়ের সংকট এবং অন্তহীন দায়িত্বের চাপ তাঁদের ক্লান্ত করে তোলে। অনেক নারীই মনে করেন, মাতৃত্বের যে রঙিন ছবি সমাজ তাঁদের দেখিয়েছে, বাস্তবে তার সঙ্গে কোনো মিল নেই। তাঁরা মনে করেন এটি একটি ‘ট্র্যাপ’ বা ফাঁদ, যেখান থেকে বেরোনোর কোনো পথ নেই।

২০২৩ সালের একটি পোলিশ সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৫ থেকে ১৪ শতাংশ অভিভাবক সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত। অনেক নারী মনে করেন, সন্তান মানুষ করার চাপে তাঁদের ক্যারিয়ার, ভ্রমণ এবং ব্যক্তিগত শখগুলো বিসর্জন দিতে হয়েছে। কারমেনের মতে, নিজের সন্তান অসামান্য হওয়া সত্ত্বেও মাতৃত্বের এই ‘ফুল-টাইম’ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অটোইমিউন রোগের শিকার হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজ মাতৃত্বকে একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে চাপিয়ে দেয় বলেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম সন্তান নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং একে একটি ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখছে। পেশাদার কাউন্সিলররা পরামর্শ দিচ্ছেন, অন্যের চাপে নয় বরং সমস্ত চ্যালেঞ্জ বুঝে তবেই সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। মা হিসেবে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং নিজের জন্য সময় বের করাই এই মানসিক চাপ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *