মানসিক শান্তির আড়ালে যৌনদাসের জীবন, অর্গ্যাজম ধ্যান সংস্থার কর্ত্রীদের দীর্ঘ কারাদণ্ড

মানসিক অবসাদ দূর করে মহিলাদের প্রশান্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ‘ওয়ানটেস্ট’ নামক একটি বিতর্কিত ওয়েলনেস সংস্থা। কিন্তু সেই ‘অর্গ্যাজম ধ্যান’-এর আড়ালে আসলে চলত নারকীয় যৌন শোষণ ও শ্রমের অপব্যবহার। এই চাঞ্চল্যকর মামলায় সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন সিইও নিকোল ডেডোন এবং বিক্রয় বিভাগের প্রধান র্যাচেল চেরউইৎজকে কঠোর কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। দীর্ঘ শুনানির পর বিচারক নিকোলকে ৯ বছর এবং র্যাচেলকে সাড়ে ৬ বছরের জেলের নির্দেশ দিয়েছেন।
২০০৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোয় প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি দাবি করেছিল, যৌনতৃপ্তির বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে তারা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাবে। এই অভিনব প্রচারের মাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সংস্থাটি। কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে আসে এক ভয়ঙ্কর সত্য। জানা যায়, ‘অর্গ্যাজম ধ্যান’ শেখানোর নাম করে মূলত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও দুর্বল মহিলাদের লক্ষ্যবস্তু করত এই চক্র। তাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বিনা পারিশ্রমিকে বা যৎসামান্য অর্থের বিনিময়ে যৌন কর্মকাণ্ড ও কঠিন পরিশ্রমে বাধ্য করা হতো।
আদালতে পেশ করা তথ্যানুযায়ী, নিকোল ডেডোনের সংস্থা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সদস্যদের ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলত। এরপর সেই অসহায়তাকে কাজে লাগিয়ে তাদের ওপর চালানো হতো শারীরিক ও মানসিক শোষণ। নির্যাতিতাদের বয়ান থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, কীভাবে মুক্তির পথ খুঁজতে এসে তারা এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। এক নির্যাতিতা আদালতে জানিয়েছেন, আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে তিনি নিকোলের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন এবং সেই সময় তিনি ছিলেন এই অপরাধী চক্রের জন্য অত্যন্ত সহজ লক্ষ্য।
তদন্তকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, সংস্থাটির মূল লক্ষ্য সুস্থতা প্রদান নয়, বরং সাধারণ মানুষকে শোষণের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করাই ছিল আসল উদ্দেশ্য। ২০১৭ সালে তদন্তের আঁচ পেয়ে নিকোল ১২ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে সংস্থাটি বিক্রি করে দিলেও আইনের হাত থেকে নিস্তার পাননি। ২০১৬ সাল থেকেই গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারিতে ছিল এই সংস্থা। ২০২৫ সালের জুনে পাঁচ সপ্তাহের দীর্ঘ শুনানির শেষে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং সাম্প্রতিক রায়ে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ওয়েলনেস বা সুস্থতা কেন্দ্রের নামে চলা প্রতারণা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে অবসাদগ্রস্ত মহিলাদের অসহায়তাকে পুঁজি করে যেভাবে যৌন ব্যবসার জাল বিস্তার করা হয়েছিল, তা বিচার ব্যবস্থার নজরে আসার পর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলো। আদালতের এই রায় নির্যাতিতাদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের এক নৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা এই ধরণের অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে একটি কড়া বার্তা প্রদান করল।