মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি: পাকিস্তানের মধ্যস্থতা কি ভারতের কূটনীতির জন্য বড় ধাক্কা?

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানানো হলেও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে পাকিস্তানের নাম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন—সবাই এই শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের মৌনতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে দেশে ও বিদেশে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
পাকিস্তানের প্রশংসা ও ভারতের কৌশলগত অবস্থান
দীর্ঘ ৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ইরানও পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, ভারত এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও পাকিস্তানের নাম নেওয়া থেকে সযত্নে বিরত থেকেছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক কেবল জানিয়েছে যে, তারা কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমালোচনার ঝড়
আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের এই ‘ডিপ্লোম্যাটিক উইন’ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়িয়েছে। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো মোদী সরকারের ‘বিশ্বগুরু’ ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিরোধীদের দাবি, যেখানে ভারতের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার কথা ছিল, সেখানে পাকিস্তান বাজি মেরে নিয়ে গেল। তবে শিবসেনার (ইউবিটি) মতো কিছু দল আবার সরকারের পাশেই দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, এটি ভারতের যুদ্ধ ছিল না, তাই এতে অযথা নাক গলানোর প্রয়োজন নেই।
বিশ্লেষকদের চোখে মধ্যস্থতা নাকি বার্তাবাহক
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখছেন। হর্ষ পন্থের মতো বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এখানে প্রথাগত মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং একজন ‘বার্তাবাহক’ হিসেবে কাজ করেছে। আমেরিকার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুবিধা পেতেই পাকিস্তান এই উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে, প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরুপমা রাও মনে করেন, পাকিস্তান যে আমেরিকা, ইরান এবং চীন—সবার আস্থা অর্জন করতে পেরেছে, তা ভারতের জন্য চিন্তার বিষয়।
ভারতের অর্জন ও সংযম
সমালোচনার মাঝেও অনেক বিশেষজ্ঞ ভারতের বিদেশ নীতিতে ‘সংযম’-এর প্রশংসা করেছেন। যুদ্ধের শুরুতেই ভারত আমেরিকার সাথে একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এছাড়া ইরানের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতীয় নৌবাহিনীর পাহারায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের ট্যাঙ্কারগুলো নিরাপদে নিয়ে আসা ভারতের একটি বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একঝলকে
- আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা।
- শান্তি স্থাপনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা আন্তর্জাতিক মহলে।
- ভারত যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে নীরব।
- বিরোধীদের মতে, এটি ভারতের বিদেশ নীতির জন্য বড় ধাক্কা।
- বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত সংযম বজায় রেখে নিজের বাণিজ্যিক ও জ্বালানি স্বার্থ রক্ষা করেছে।
- হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ বাণিজ্য নিশ্চিত করা ভারতের বড় সাফল্য।