মালদায় বিচারক ঘেরাও কাণ্ডে কড়া সুপ্রিম কোর্ট: ১২টি এফআইআর হাতে নিয়ে ময়দানে নামল এনআইএ

মালদায় বিচারক ঘেরাও কাণ্ডে কড়া সুপ্রিম কোর্ট: ১২টি এফআইআর হাতে নিয়ে ময়দানে নামল এনআইএ

পশ্চিমবঙ্গের মালদায় ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) কাজে নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের ঘেরাও ও হেনস্থার ঘটনায় তদন্ত শুরু করল ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA)। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরপরই বুধবার মালদায় পৌঁছে ১২টি এফআইআর নতুন করে দায়ের করেছে কেন্দ্রীয় এই তদন্তকারী সংস্থা। মোথাবাড়ি থানার ৭টি এবং কালিয়াচক থানার ৫টি মামলা এখন থেকে এনআইএর অধীনে তদন্তাধীন হবে।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও কড়া নির্দেশ

এই ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে তদন্তভার এনআইএর হাতে তুলে দেয়। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে এবং সরকারি কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়ছে। স্থানীয় পুলিশের উপর ভরসা না রেখে আদালত এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তদুপরি, এনআইএ আইনের নির্ধারিত তালিকার বাইরে থাকা অপরাধ হলেও এই ঘটনার তদন্তভার এনআইএ-কেই দেওয়া হয়েছে।

৯ ঘণ্টার দুঃসহ পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক গাফিলতি

ঘটনার সূত্রপাত ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া চলাকালীন। কালিয়াচক এলাকায় ৩ জন মহিলা ও ৫ বছরের এক শিশুসহ ৭ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে কোনো খাবার বা জল ছাড়া ঘেরাও করে রাখা হয়। উগ্র জনতা ও সমাজবিরোধীদের এই হামলায় কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা চরম সংকটের মুখে পড়ে। সুপ্রিম কোর্ট এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজ্যের মুখ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়েছে যে, ঘটনার রাতে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ফোন না তোলার জন্য তাঁকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।

তদন্তের মূল গতিপ্রকৃতি

এনআইএর তদন্তে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে:

  • পরিকল্পিত হামলা: আদালত মনে করছে এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিক্ষোভ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত হতে পারে।
  • অভিযুক্তদের পরিচয়: এখন পর্যন্ত ৪৩২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ জন সরাসরি উপদ্রবকারী হিসেবে চিহ্নিত এবং অনেকেরই অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে।
  • গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ: স্থানীয় পুলিশ ইতিমধ্যেই মোফাককরুল ইসলাম ও মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান আলী কাদরীসহ ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এনআইএ এখন এই মূল পাণ্ডাদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডের প্রায় ৭০০ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের ৬০ লক্ষ আবেদনের নিষ্পত্তির কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বিচারকদের ওপর এমন আক্রমণ গোটা প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট এনআইএ-কে নির্দেশ দিয়েছে নিয়মিত স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিতে এবং তদন্তের রিপোর্ট কলকাতার এনআইএ বিশেষ আদালতে পেশ করতে।

একঝলকে

  • ঘটনার স্থান: মালদা জেলার মোথাবাড়ি ও কালিয়াচক।
  • তদন্তকারী সংস্থা: এনআইএ (NIA), সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে।
  • মামলার সংখ্যা: মোট ১২টি এফআইআর নতুন করে নথিভুক্ত।
  • আক্রান্ত: ৭ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা (মহিলা ও শিশুসহ)।
  • অভিযোগ: ৯ ঘণ্টা জল ও খাবার ছাড়া ঘেরাও করে রাখা এবং কাজে বাধা দান।
  • আদালতের অবস্থান: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দায়িত্ব প্রদান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *