শ্মশানে জ্বলন্ত চিতার ভস্মে হোলি! বারাণসীর মণিকর্ণিকায় অঘোরিদের এই রহস্যময় উৎসবের নেপথ্যে কী কাহিনী রয়েছে

বারাণসী মানেই এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক টান। গঙ্গার ঘাট, সন্ধ্যার আরতি আর অলিগলির ভিড় ছাপিয়েও কাশীর এক অনন্য রূপ প্রকাশ পায় দোল উৎসবের সময়। যখন সারা দেশ আবির আর রঙের উৎসবে মেতে ওঠে, তখন মহাদেবের প্রিয় নগরী বারাণসীর মণিকর্ণিকা ঘাটে খেলা হয় এক শিহরণ জাগানো হোলি। এখানে রঙের বদলে বাতাসে ওড়ে মরা মানুষের চিতার ছাই। শতাব্দী প্রাচীন এই প্রথা যা ‘মাসান হোলি’ নামে পরিচিত, তা দেখতে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ভিড় জমান বেনারসে।
চিতার ছাইয়ে কেন হোলি খেলেন অঘোরিরা
পুরাণ মতে, ‘রংবারী একাদশী’র দিন ভগবান শিব মা পার্বতীকে গৌরী রূপে নিয়ে প্রথমবার কাশীতে পা রেখেছিলেন। সেই খুশিতে দেবতারা ফুল ও আবির নিয়ে উৎসব মেতে ওঠেন। কিন্তু মহাদেবের অতি প্রিয় গণ বা ভক্তরা হলেন ভূত, প্রেত, পিশাচ এবং অঘোরিরা। লোকালয়ের উৎসবে তাদের প্রবেশাধিকার না থাকায় মহাদেব ব্যথিত হন। কথিত আছে, প্রিয় ভক্তদের মন রক্ষা করতে একাদশীর ঠিক পরের দিন তিনি মহাশ্মশানে পৌঁছান এবং জ্বলন্ত চিতার ছাই দিয়ে হোলি খেলেন। সেই থেকেই এই ‘দিগম্বর হোলি’ বা মাসান হোলির সূচনা।
মণিকর্ণিকা ঘাটের গা শিউরে ওঠা দৃশ্য
কাশীর মণিকর্ণিকা এবং হরিশচন্দ্র ঘাটে সারা বছরই চিতা জ্বলে। কিন্তু হোলির এই বিশেষ দিনে দৃশ্যপট বদলে যায়। স্থানীয় সন্ন্যাসী ও অঘোরিরা ভোরে ‘মহাশ্মশান নাথ’ বা শ্মশানের অধিপতি শিবের মন্দিরে বিশেষ পুজো ও আরতি সম্পন্ন করেন। এরপরই শুরু হয় মূল উৎসব। হাতে ডুগডুগি আর শঙ্খধ্বনি নিয়ে অঘোরিরা যখন “খেল মাসানে মে হোলি দিগম্বর” গানে মেতে ওঠেন, তখন আকাশ-বাতাস চিতার ছাইয়ে ধূসর হয়ে যায়।
মৃত্যু ও জীবনের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ
সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যু শোকের হলেও, বারাণসীর এই ঘাটে মৃত্যুকে উৎসব হিসেবে দেখা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই ছাই মাখার অর্থ হলো জীবনের অনিত্যতাকে স্বীকার করে নেওয়া এবং মহাদেবের চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়া। একদিকে ঘাটে মৃতদেহ দাহ করা হচ্ছে, আর ঠিক তার পাশেই জ্বলন্ত চিতার ছাই দিয়ে আবির খেলার এই দৃশ্যটি জীবন ও মৃত্যুর এক অলৌকিক মেলবন্ধন তৈরি করে। কাশীর এই প্রাচীন ঐতিহ্য আজও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহাদেব কেবল শুভ কাজের দেবতা নন, তিনি ধ্বংসের অধিপতি হয়েও ভক্তের কাছে পরম করুণাময়।