সমুদ্রতলে অদৃশ্য দানব আইএনএস অরিধমন আসছে ভারতীয় নৌসেনায়

ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে খুব শীঘ্রই যুক্ত হতে চলেছে দেশের তৃতীয় পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন ‘আইএনএস অরিধমন’। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই যুদ্ধজাহাজটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে তিনি অরিধমন শব্দটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে একে শক্তির প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশাখাপত্তনমে তৈরি এই সাবমেরিনটি ভারতের সামরিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় তৈরি করতে চলেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, আইএনএস অরিধমনের শেষ পর্যায়ের সামুদ্রিক পরীক্ষা বা ‘সি ট্রায়াল’ ইতিমধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালে আইএনএস অরিহন্ত এবং ২০২৪ সালে আইএনএস অরিঘাত নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তৃতীয় এই সাবমেরিনটি যুক্ত হওয়ার ফলে ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড’ আরও শক্তিশালী হবে। নৌসেনা প্রধান অ্যাডমিরাল দিনেশ কে ত্রিপাঠীর ইঙ্গিত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়েই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন করা হতে পারে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে আইএনএস অরিধমন আগের সাবমেরিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। প্রায় ৭,০০০ টন ওজনের এই ডুবোজাহাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘লো অ্যাকউস্টিক সিগনেচার’। অর্থাৎ, এটি সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে অত্যন্ত নিঃশব্দে চলাচল করতে সক্ষম, যার ফলে শত্রুপক্ষের রেডার বা সোনারের পক্ষে একে শনাক্ত করা প্রায় আসাম্ভব। এই ‘অদৃশ্য’ ক্ষমতাই অরিধমনকে প্রকৃত অর্থে সমুদ্রের দানবে পরিণত করেছে।
সাবমেরিনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ৮৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রেসারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর, যা তৈরি করেছে ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC)। এই পরমাণু প্রযুক্তির কারণে সাবমেরিনটিকে ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের মতো চার্জ দেওয়ার জন্য বারবার জলের উপরে ভেসে উঠতে হবে না। এটি দীর্ঘ সময় গভীর সমুদ্রে ডুবে থেকে শত্রুর ওপর নজরদারি এবং অতর্কিত হামলা চালাতে সক্ষম।
অস্ত্র বহনের ক্ষমতায় আইএনএস অরিধমন এক বড়সড় চমক দিয়েছে। এতে রয়েছে ৮টি ভার্টিক্যাল লঞ্চ টিউব, যা আইএনএস অরিহন্তের তুলনায় দ্বিগুণ। এটি একসঙ্গে ৮টি কে-৪ ব্যালিস্টিক মিসাইল অথবা ২৪টি কে-১৫ মিসাইল বহন করতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা ৩,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে সমুদ্রের যে কোনো প্রান্ত থেকে শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানা এখন ভারতের হাতের মুঠোয়।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএনএস অরিধমনের অন্তর্ভুক্তি ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। এর ফলে ভারতের অন্তত একটি পরমাণু অস্ত্রবাহী সাবমেরিন সবসময় সমুদ্রে টহলরত অবস্থায় থাকবে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। সব মিলিয়ে, নীল জলরাশিতে ভারতের আধিপত্য বজায় রাখতে অরিধমন এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।