সুদীপ্ত সেনের জেলমুক্তি: সারদা কাণ্ডের সেই স্মৃতি আর মমতার সেই ঐতিহাসিক মন্তব্য— ‘যা গেছে তা গেছে’!

সুদীপ্ত সেনের জেলমুক্তি: সারদা কাণ্ডের সেই স্মৃতি আর মমতার সেই ঐতিহাসিক মন্তব্য— ‘যা গেছে তা গেছে’!

দীর্ঘ ১২ বছরের কারাবাস শেষে অবশেষে জেলমুক্ত হতে চলেছেন সারদা গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে কাশ্মীরের সোনমার্গ থেকে গ্রেফতার হওয়ার পর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ এক যুগ। বৃহস্পতিবার তাঁর জেলমুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতেই নতুন করে চর্চায় উঠে এসেছে ভারতের অন্যতম বৃহৎ এই চিটফান্ড কেলেঙ্কারি। আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি তছরুপের এই মামলায় সুদীপ্ত সেনের মুক্তি আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ হলেও, কয়েক লক্ষ সর্বস্বান্ত আমানতকারীর কাছে আজও বড় প্রশ্ন— ‘টাকা কি আদৌ ফিরবে?’

সারদা সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের নেপথ্যে

২০০০ সালের দিকে সুদীপ্ত সেনের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হলেও ২০০৬ সালে সারদা গোষ্ঠী গঠনের পর তাঁর প্রতিপত্তি আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। অত্যন্ত চতুরতার সাথে সাধারণ মানুষকে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তিনি।

  • প্রলোভন ও স্কিম: ১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে ১৪ বছরে ১০ লক্ষ টাকা রিটার্ন দেওয়ার মতো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। জমি বা ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েও টাকা তোলা হয়েছিল বাজার থেকে।
  • এজেন্ট নেটওয়ার্ক: বিনিয়োগকারী আনতে পারলে এজেন্টদের জন্য থাকত দামী উপহার এবং প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মোটা অংকের কমিশন। ফলে গ্রাম থেকে শহর— সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল সারদার জাল।
  • মিডিয়া ও গ্ল্যামার: প্রায় ৯৮৮ কোটি টাকার বিশাল মিডিয়া সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন সুদীপ্ত সেন। নামী তারকা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করাই ছিল মূল লক্ষ্য।

রাজনীতি ও সারদা কাণ্ডের যোগসূত্র

সারদা মামলা কেবল একটি আর্থিক জালিয়াতি ছিল না, এর শিকড় ছিল রাজনীতির গভীরে। তদন্তে নেমে সিবিআই একের পর এক প্রভাবশালী নাম সামনে এনেছিল।

  • তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব: শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক সাংসদ, বিধায়ক ও তৎকালীন মন্ত্রীদের নাম এই কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছিল। কেউ সরাসরি গোষ্ঠীর পদে ছিলেন, কেউ আবার এর প্রচারক হিসেবে কাজ করেছেন।
  • জাতীয় রাজনীতির ছায়া: কেবল পশ্চিমবঙ্গেই নয়, আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা মাতঙ্গ সিংয়ের নামও তদন্তের তালিকায় উঠে এসেছিল।
  • প্রশাসনের ভূমিকা: তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন উঠেছিল, যা আজও আইনি লড়াইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি

২০১৩ সালে সারদা সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার পর থেকেই শুরু হয় হাহাকার। এজেন্টদের বাড়িতে ভাঙচুর থেকে শুরু করে এজেন্ট ও আমানতকারীদের আত্মহত্যার মতো ঘটনা রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তৎকালীন সময়ে ‘যা গেছে তা গেছে’ জাতীয় মন্তব্য করা হলেও, সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ফেরানোর কোনো সুরাহা আজও হয়নি। দীর্ঘ বিচারে অনেক মামলায় সুদীপ্ত সেন ও দেবযানী মুখোপাধ্যায় বেকসুর খালাস পেলেও আমানতকারীদের শূন্য পকেট আজও পূর্ণ হয়নি।

একঝলকে

  • গ্রেফতার: ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের সোনমার্গ থেকে।
  • কারাবাস: দীর্ঘ ১২ বছর বা এক যুগ ধরে জেলবন্দি ছিলেন সুদীপ্ত সেন।
  • তছরুপের পরিমাণ: আনুমানিক ২,৫০০ কোটি টাকারও বেশি।
  • মূল অভিযুক্ত: সুদীপ্ত সেন এবং তাঁর সহযোগী দেবযানী মুখোপাধ্যায়।
  • বর্তমান স্থিতি: আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পাওয়ায় ১২ বছর পর জেলমুক্তির পথে সারদাকর্তা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *