হর্মুজ প্রণালী অবরোধের হুমকি ট্রাম্পের! ভারতের রান্নাঘর থেকে কৃষিক্ষেত্র—সবই কি মহার্ঘ্য হতে চলেছে?

হর্মুজ প্রণালী অবরোধের হুমকি ট্রাম্পের! ভারতের রান্নাঘর থেকে কৃষিক্ষেত্র—সবই কি মহার্ঘ্য হতে চলেছে?

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোর্মুজ প্রণালী অবরোধের ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সোমবার সকাল থেকেই ইরানি বন্দরগুলো লক্ষ্য করে নৌ-অবরোধ কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের মতো দেশ, যারা তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটায়, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও হোর্মুজ প্রণালীর গুরুত্ব

হোর্মুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ এবং এলএনজি (LNG) পরিবাহিত হয়। ভারত তার প্রয়োজনীয় পেট্রোলিয়ামের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে, যার একটি বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে আসে।

  • তেল নির্ভরতা: ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৫০ শতাংশই হোর্মুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। যদিও ভারত বর্তমানে ৪১টি দেশ থেকে তেল আমদানি করে উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করেছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা এখনও প্রবল।
  • এলপিজি ও এলএনজি সংকট: ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলপিজি এবং চতুর্থ বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারক। রান্নার গ্যাস বা এলপিজির প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি হয়, যার ৯০ শতাংশই আসে এই প্রণালী দিয়ে। কাতার ও ইরান থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইতিমাজেই শিল্পক্ষেত্রে এলএনজি সরবরাহে ২০ শতাংশ কাটছাঁট করা হয়েছে।

কৃষিখাত ও সার সরবরাহে প্রভাব

জ্বালানি ছাড়াও ভারতের কৃষিখাত এই অবরোধের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সার (ইউরিয়া, পটাশ, অ্যামোনিয়া) এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়।

  • কাঁচামালের অভাব: ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার ব্যবহারকারী দেশ। ইউরিয়া তৈরির মূল উপাদান হলো প্রাকৃতিক গ্যাস, যার ৮৫ শতাংশই ভারত আমদানি করে।
  • উৎপাদন ঝুঁকি: জুন-জুলাই মাসে ভারতের প্রধান বপন মৌসুম শুরু হয়। হোর্মুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে বা বীমা ও পরিবহন খরচ বাড়লে সারের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যা সরাসরি কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

ওষুধ শিল্প ও ওষুধের বৈশ্বিক বাজার

ভারতের ওষুধ শিল্প বা ফার্মা সেক্টর বিশ্ববাজারে ২০ শতাংশ দখল করে আছে। বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপে জেনেরিক ওষুধ রপ্তানিতে ভারত শীর্ষে।

  • পেট্রোকেমিক্যাল থেকে উৎপাদিত ইথিলিন ও মিথানল অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভ্যাকসিনের প্রধান উপাদান, যা মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসে।
  • দুবাইয়ের মতো বিমানবন্দরগুলো ভারতের ওষুধ রপ্তানির প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যার ফলে ওষুধের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

ভারতীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব

চলমান এই অস্থিরতা ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) ২০২৭ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭.৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬.৯ শতাংশ করেছে।

  • টাকার মান ও মুদ্রাস্ফীতি: ডলারের বিপরীতে রুপির মান তলানিতে নামায় আমদানি খরচ আরও বাড়ছে। এর ফলে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়লে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
  • প্রবাসী আয় (Remittance): উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় ৯০ লক্ষ ভারতীয় কর্মরত। সেখানে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে প্রবাসী আয়ের ওপর বড় ধাক্কা আসতে পারে, যা ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

একঝলকে

  • তেলের দাম: ব্রেন্ট ক্রুড ১০২ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১০৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
  • পরিবহন: ভারতের ৫০% তেল এবং ৯০% এলপিজি আমদানি হোর্মুজ প্রণালী নির্ভর।
  • কৃষি: সারের কাঁচামাল আমদানিতে বাধার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি।
  • জিডিপি: আরবিআই ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৬.৯% করেছে।
  • আমদানি: গত ৭ বছরে প্রথমবার ২ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল রিলায়েন্সের জন্য ভারতের পথে রওয়ানা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *