হোরমুজ প্রণালী বন্ধ হলেও সুরক্ষিত থাকবে চীন, কেন ড্রাগন সাম্রাজ্যের জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই

হোরমুজ প্রণালী বন্ধ হলেও সুরক্ষিত থাকবে চীন, কেন ড্রাগন সাম্রাজ্যের জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই

পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হোরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশ যখন এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন, তখন চীন তুলনামূলকভাবে অনেকটাই স্বস্তিতে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করলেও, গত কয়েক বছরে বেইজিং এমন কিছু সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ করেছে যার ফলে বিশ্বজুড়ে তেল সংকট তৈরি হলেও দেশটির ওপর তার প্রভাব পড়বে অত্যন্ত সীমিত। চীনের সরকারি মাধ্যমও দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছে যে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা যথেষ্ট মজবুত রয়েছে।

চীনের এই জ্বালানি নিরাপত্তার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা ইভি-র অভূতপূর্ব প্রসার। ২০২৫ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ গাড়িকে বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, গত বছরই সেই হার প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের এই অভাবনীয় বৃদ্ধির ফলে দেশটিতে তেলের চাহিদাও এখন স্থিতিশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভি ব্যবহারের ফলে চীন যে পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করছে, তা সৌদি আরব থেকে আমদানিকৃত তেলের পরিমাণের প্রায় সমান। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও চীনের অভ্যন্তরীণ পরিবহণ ব্যবস্থা বড় কোনো ধাক্কা খাবে না।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও চীন স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মূলত নিজস্ব কয়লা সম্পদ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা নবায়নযোগ্য শক্তি বা গ্রিন এনার্জির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে সৌর ও বায়ু শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীন বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেইজিংকে খুব একটা বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয় না। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এই টেকসই জ্বালানি নীতি চীনকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে, যা অন্যান্য এশীয় দেশগুলোর তুলনায় তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।

কৌশলগতভাবে চীন তার তেল আমদানির উৎসগুলোকে বহুমুখী করেছে। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইরানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তেল সংগ্রহ করছে বেইজিং। এর পাশাপাশি চীনের হাতে রয়েছে বিশাল তেলের মজুদ। হিসাব অনুযায়ী, হোরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলেও চীন তার সংরক্ষিত মজুদের মাধ্যমে টানা সাত মাস চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মিয়ানমারের সঙ্গে পাইপলাইন সংযোগ সমুদ্রপথের ওপর তাদের নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন ক্রমাগত বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। বিকল্প শক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে যা বড় কোনো বিশ্ব সংকটেও চীনের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করবে। যদিও ভবিষ্যৎ পাইপলাইন প্রকল্পগুলোর কাজ এখনও প্রক্রিয়াধীন, তবুও বর্তমান পরিকাঠামোই বেইজিংকে জ্বালানি যুদ্ধে এক ধাপ এগিয়ে রেখেছে। সামগ্রিকভাবে, ড্রাগন সাম্রাজ্যের এই বহুমুখী জ্বালানি কৌশল যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *