১৪ সেকেন্ডের জন্য থমকে যেত হৃদস্পন্দন, ২৬ বছরেই স্ট্রোক জয় করে হার্ভার্ডের বিজ্ঞানী আঞ্জেলিকি

লন্ডনের বাসিন্দা আঞ্জেলিকি আসিমাকির জীবনের গল্প যেকোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। বর্তমানের ৪৫ বছর বয়সি এই কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞ আজ হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচানোর পথ দেখাচ্ছেন, কিন্তু একটা সময় তাঁর নিজের জীবনই ছিল চরম অনিশ্চয়তায় ভরা। মাত্র ২৫ বছর বয়সে যখন তাঁর সমবয়সিরা ক্যারিয়ার গড়ায় ব্যস্ত, তখন আঞ্জেলিকি লড়ছিলেন এক রহস্যময় শারীরিক সমস্যার সঙ্গে। হঠাৎ হঠাৎ মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বলতা আর দিনের মধ্যে একাধিকবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এক অদম্য জীবন
পরিবারে হার্টের রোগের কোনো ইতিহাস না থাকায় চিকিৎসকরাও প্রথমে বুঝতে পারেননি আসল সমস্যা কোথায়। ব্রেন টেস্ট থেকে শুরু করে সুগার বা থাইরয়েড—সব পরীক্ষার রিপোর্টই আসছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা আরও গভীর ছিল। দীর্ঘ পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা স্তম্ভিত হয়ে যান যখন দেখা যায়, আঞ্জেলিকির হার্টবিট মিনিটে ১২০ বারের বেশি হলেই তাঁর হৃদস্পন্দন টানা ১৪ সেকেন্ডের জন্য পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইন্টারমিটেন্ট কমপ্লিট এভি ব্লক’। এই অবস্থায় হৃৎপিণ্ডের উপরের অংশ থেকে নিচের অংশে কোনো বৈদ্যুতিক সংকেত পৌঁছাতে পারে না।
একের পর এক অস্ত্রোপচার ও স্ট্রোকের ধাক্কা
জীবন বাঁচাতে আঞ্জেলিকির শরীরে বসানো হয় পেসমেকার। কিন্তু লড়াই সেখানেই শেষ হয়নি। নব্বইয়ের দশকের সেই প্রযুক্তিতে ছিল হাজারো বিধিনিষেধ—মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার বারণ, ছোট ঘরে থাকা নিষেধ, এমনকি বারবার ব্যাটারি বদলানোর ধকল। এর মধ্যেই ঘটে যায় চরম বিপর্যয়। মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। পরবর্তী পরীক্ষায় ধরা পড়ে তাঁর হার্টে একটি বড় ছিদ্র রয়েছে, যা সারাতে প্রয়োজন ছিল ওপেন-হার্ট সার্জারি। সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে তাঁকে মোট ৯ বার বড় অস্ত্রোপচারের টেবিল যেতে হয়েছে, যার মধ্যে ছিল ৫ বার পেসমেকার পরিবর্তন ও ৩ বার অ্যাব্লেশন।
হার্ভার্ড থেকে আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন
অসুস্থতা আঞ্জেলিকির শরীরকে দুর্বল করলেও তাঁর জেদকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। অসুস্থ শরীর নিয়েই তিনি লন্ডনে কার্ডিওমায়োপ্যাথি বিষয়ে পিএইচডি শেষ করেন। এরপর পাড়ি জমান বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে দীর্ঘ ১১ বছর গবেষণার পর তিনি এমন এক যুগান্তকারী পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব এনে দিয়েছে। এখন আর বিপজ্জনক হার্ট বায়োপসির প্রয়োজন নেই; সামান্য গালের কোষ বা ‘চিক-সোয়াব’ দিয়েই অত্যন্ত জটিল ‘অ্যারিথমোজেনিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ (ACM) শনাক্ত করা সম্ভব।
বিজ্ঞানের আলোয় আগামীর স্বপ্ন
আজ আঞ্জেলিকি কেবল একজন সফল বিজ্ঞানীই নন, তিনি দুই সন্তানের মা। তাঁর মাতৃত্বের পথটিও ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে তাঁর সন্তানরা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। নিজের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি হার্টের রোগের চিকিৎসাকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে চান। আঞ্জেলিকির এই লড়াই প্রমাণ করে দেয় যে, বিজ্ঞানের শক্তি আর মানুষের মনের জোর থাকলে মৃত্যুর দুয়ার থেকেও জয়ী হয়ে ফিরে আসা সম্ভব। তিনি থামতে রাজি নন; তাঁর লক্ষ্য এখন আরও জটিল হৃদরোগের সহজ সমাধান খুঁজে বের করা।