নিপাহ আতঙ্ক: বিয়েবাড়ি ও নাইট ডিউটি থেকে ছড়ালো ভাইরাস? কেন্দ্রীয় রিপোর্টে উদ্বেগ, গভীর সংকটে ২ নার্স `

নিপাহ আতঙ্ক: বিয়েবাড়ি ও নাইট ডিউটি থেকে ছড়ালো ভাইরাস? কেন্দ্রীয় রিপোর্টে উদ্বেগ, গভীর সংকটে ২ নার্স `

নদিয়ার বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন একটি গ্রামের বিয়েবাড়ি এবং পরপর দু’দিন একসঙ্গে নাইট ডিউটি – প্রাথমিকভাবে এই দুটি বিষয়কেই দুই নার্সের নিপাহ সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ‘ন্যাশনাল জয়েন্ট আউটব্রেক রেসপন্স টিম’ (NJORT)। তাদের ১১ পাতার রিপোর্টে সরাসরি নিশ্চিত না করলেও, এই বিষয় দুটির ওপরই সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। বুধবারও বারাসাতের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে এই দুই নার্স গভীর কোমায় ভেন্টিলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

অন্যদিকে, কাটোয়ার সিস্টার-নার্সের সংস্পর্শে আসা বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এক হাউসস্টাফ এবং এক নার্সের শরীরে উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তাদের বুধবার বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দু’জনেরই সর্দি-কাশির মতো সামান্য উপসর্গ রয়েছে, তবে নিপাহ সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ এটি হওয়ায় কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। এছাড়া, বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অ্যাকিউট এনকেফালোপ্যাথি সিনড্রোম নিয়ে ভর্তি হওয়া আরও একজনকে নিপাহ সন্দেহে আইডি-তে স্থানান্তর করা হয়েছে।

নিপাহের উৎস নিয়ে কেন্দ্রীয় রিপোর্টে ইঙ্গিত

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের চিন্তায় রাখা নিপাহ সংক্রমণের উৎস সম্পর্কে কেন্দ্রীয় NJORT-এর রিপোর্টে কিছু আলোকপাত করা হয়েছে। রিপোর্টে দুই নার্সের সংক্রমণের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাদের গতিবিধি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গত ১৫ থেকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে সিস্টার নার্স নদিয়া জেলার ঘুগরাগাছি গ্রামে একটি পারিবারিক বিয়েতে যোগ দিয়েছিলেন। এই এলাকাটি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এবং খেজুর রস ও খেজুর গুড় খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এপিডেমিওলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে এই অঞ্চলটি বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে নিপাহ সংক্রমণের (জুনোটিক স্পিল ওভার) সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত। যদিও ওই সিস্টার-নার্স খেজুর রস বা গুড় খেয়েছিলেন কিনা, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি, তবে রিপোর্টে ধারণা করা হয়েছে যে, এই সফরেই নার্সের প্রাথমিক সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস তৈরি হয়েছিল।

ঘুগরাগাছি থেকে ফেরার পর ১৮ থেকে ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে সিস্টার-নার্স হালকা সর্দি-কাশিতে ভুগলেও জ্বর আসেনি। ৩০ ডিসেম্বর তার প্রথম জ্বর আসে এবং ৩১ ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে একটি পরীক্ষার জন্য যাওয়ার পথে তার জ্বর বেড়ে যায়। এরপর হাওড়া স্টেশন থেকে কাটোয়ায় বাবার বাড়িতে ফিরে যান। ১ থেকে ৩ জানুয়ারি তার ১০২-১০৩ ডিগ্রি প্রবল জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা, বমি ভাব এবং সারা শরীরে অস্বস্তি ছিল। ৩ তারিখ অচেতন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সময়েই, ২০ ও ২১ ডিসেম্বর ওই ব্রাদার-নার্স তার সাথে পরপর দু’দিন নাইট ডিউটি করেছিলেন। যদিও দীর্ঘ সময় ধরে কাছাকাছি থাকার কোনো নিশ্চিত তথ্য মেলেনি, তাই সরাসরি সংক্রমণের পক্ষে স্পষ্ট এপিডেমিওলজিক্যাল প্রমাণও প্রতিষ্ঠিত করা যাচ্ছে না।

এরপর ২৭ ডিসেম্বর ওই ব্রাদার-নার্সও অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেদিন তার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ৪ জানুয়ারি হাসপাতালে ভর্তির পরেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। ৮ ও ৯ তারিখ তার শ্বাসকষ্ট ও স্নায়বিক গোলযোগ শুরু হয়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, অসুস্থ হওয়ার আগের একমাস তিনি বারাসাত হাসপাতালের উল্টোদিকে যেখানে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতেন, বাড়ি-হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও যাননি।

রিপোর্টে রোগীর অবস্থা

রিপোর্টে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, দুই নার্সের নিপাহ সংক্রমণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের ‘গ্লাসগো কোমা স্কেল স্কোর’ ৫-এর নিচে নেমে গেছে। এই স্কোর ১ থেকে ১৫ পর্যন্ত হয়, যেখানে ১৫ মানে সম্পূর্ণ সচেতন। ১০-এর নিচে মানে কোমায় চলে যাওয়া। অর্থাৎ দু’জনেই এখন গভীর কোমায় রয়েছেন এবং তাদের মস্তিষ্ক প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এমআরআই ও সিটি স্ক্যানে দেখা গেছে, তাদের মস্তিষ্কের দু’দিকই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত, ব্রেন স্টেম, সেরিবেলাম ও হোয়াইট ম্যাটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি, দুজনের মস্তিষ্কেই ছোট ছোট অনেক ‘ইনফার্কট-লাইক লিশনস’ (infarct-like lesions) আছে, অর্থাৎ বিভিন্ন জায়গায় রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গেছে, যা ইস্কেমিক ব্রেন স্ট্রোকের মতো।

সতর্ক স্বাস্থ্যভবন

স্বাস্থ্যভবন অত্যন্ত সজাগ রয়েছে, যাতে তাদের সংস্পর্শে আসা কেউ হোক বা অন্য কেউ—উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে কোনো দেরি না হয়। মঙ্গলবার ১২০ জনকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছিল এবং বুধবার এই সংখ্যা বেড়ে আরও ৮২ হয়েছে। এর মধ্যে বর্ধমানে নতুন করে ৩৪ জনকে বাড়িতে কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে। বুধবার বর্ধমানে কেন্দ্রীয় NJORT-এর সদস্যরা পরিদর্শন করেন এবং স্বাস্থ্যভবনের কর্মকর্তাদের সাথে ভার্চুয়াল বৈঠকও করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *