ডিএনএ টেস্টে ফাঁস ৭৪ বছরের পুরনো রহস্য! মৃত ভেবে আসা ৫০ জন আত্মীয়ের হদিস পেলেন বৃদ্ধা

অস্ট্রেলিয়া: বর্তমান যুগে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে, বিশেষ করে হারিয়ে যাওয়া পরিবার বা পরিজনকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে। অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা ৭৪ বছর বয়সী আদ্রিয়ানা টার্কের গল্পটি এর এক অনন্য উদাহরণ।
তিনি কখনও কল্পনাও করেননি যে একটি ডিএনএ টেস্ট তাঁর জীবন বদলে দেবে। আদ্রিয়ানার বাবা ছিলেন জার্মান ইহুদি। ১৯৩৭ সালে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর ভয়ে তিনি জার্মানি ছেড়ে পালিয়ে যান। ছোটবেলা থেকেই আদ্রিয়ানা জানতেন যে তাঁর পরিবারের বাকি সদস্যরা হলোকাস্ট বা নাৎসি গণহত্যায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর বাবা তাঁকে বলেছিলেন যে তাঁদের কোনো আত্মীয় আর জীবিত নেই। সেই কারণেই আদ্রিয়ানা কখনও তাঁর পুরনো পরিবারকে খোঁজার চেষ্টা করেননি।
ভাইয়ের মৃত্যুর পর সিদ্ধান্ত বদল
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আদ্রিয়ানার ভাই জুলিয়ানের মৃত্যু হয়। এরপর তিনি নিজেকে পৃথিবীতে সম্পূর্ণ একা মনে করতে থাকেন। এই সময়েই তাঁর মনে নিজের পারিবারিক ইতিহাস জানার ইচ্ছা জাগে। অতীতের কিছু তথ্য পাওয়ার আশায় তিনি ‘MyHeritage’ কো ম্পা নি থেকে নিজের ডিএনএ পরীক্ষা করান। কিন্তু রিপোর্টের ফলাফল দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। রিপোর্টে প্রকাশ পায় যে, তাঁর ৫০ জনেরও বেশি আত্মীয় আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জীবিত রয়েছেন।
দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ভুল প্রমাণিত হলো
ডিএনএ রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, তাঁর ঠাকুমার পরিবারের তিন সদস্য গণহত্যার সময় কোনোভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ ইজরায়েল সহ বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে। আদ্রিয়ানা তাঁর অনেক তুতো ভাই-বোন, মাসি এবং কাকার খোঁজ পান। তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হন ইজরায়েলে বসবাসকারী তাঁর ৭৩ বছর বয়সী তুতো ভাই রামান গিড্রনের সঙ্গে কথা বলে, যিনি পেশায় একজন চিকিৎসক। আদ্রিয়ানা জানান, তিনি নিজেকে সবসময় একা ভাবতেন, কিন্তু এই আবিষ্কার তাঁর জীবনের শূন্যতা পূরণ করে দিয়েছে।
নাৎসি অত্যাচারের শিকার হয়েছিল পরিবার
রামানের মাকে নাৎসি আমলে অত্যন্ত ভয়াবহ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি রাখা হয়েছিল। তিনি প্রথমে থেরেসিয়েনস্টাট ক্যাম্পে এবং পরে আউশভিৎজে ছিলেন। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে ফেরেন এবং নতুন জীবন শুরু করেন। রামান জানান, তাঁর কাছে কেবল এটুকুই তথ্য ছিল যে অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডে তাঁদের কিছু আত্মীয় থাকতে পারেন, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট যোগাযোগ ছিল না।
আশার আলো দেখালো এই পুনর্মিলন
আদ্রিয়ানা এবং রামানের এই যোগাযোগ এমন এক সময়ে হলো যখন বিশ্বজুড়ে হলোকাস্ট মেমোরিয়াল ডে পালন করা হচ্ছিল। আদ্রিয়ানা বলেন, এতগুলো বছর তিনি নিজেকে পরিবারহীন বা ‘নিখোঁজ’ মনে করতেন, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে জীবনের হারানো অংশ ফিরে পেয়েছেন। বর্তমানে অনেক ইহুদি পরিবার ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়দের খুঁজে পাচ্ছেন। রামানের মতে, তাঁদের এই কাহিনী ভয় ও ঘৃণার আবহে আশার বার্তা দেয়—পরিবার এবং মানবিক সম্পর্ক যেকোনো ঘৃণার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এখন আদ্রিয়ানা তাঁর নতুন খুঁজে পাওয়া বিশাল পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন এবং সেই সম্পর্কগুলোকে উপভোগ করছেন যা নিয়ে তিনি কখনও ভাবতেও পারেননি।