সংসদে কেন্দ্রীয় বাজেটের উপর আলোচনায় ক্ষোভ প্রকাশ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের

বাইজিদ মন্ডল:- তৃণমুলের সাধারণ সম্পাদক সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এখানে কেবল একজন সাংসদ হিসেবে নয়, বরং সেই কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে দাঁড়িয়েছি যাদের ‘আচ্ছে দিন’-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং যারা আজ আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির চাপে বেঁচে থাকার লড়াই করছে। এই বাজেট অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে না, এটি কেবল খবরের হেডলাইন তৈরি করে। এই বাজেট তাদের বাহবা দেয়, যারা বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে কর ফাঁকি দিতে পারে এবং তাদের শাস্তি দেয় যারা সততার সাথে কর দেয়। অর্থমন্ত্রী মনে হচ্ছে ‘উল্টো রবিনহুড’ মডেল অনুসরণ করছেন। তিনি কর এবং মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে গরিবদের নিঃস্ব করছেন, আর অন্যদিকে ছাড় ও সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে ধনীদের পুরস্কৃত করছেন। এমনকি এক কাপ চায়ের উপরও জিএসটি লাগে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি আসে নানা শর্ত, ধারা, উপধারা এবং নিয়মের বেড়াজালে। এটি কোনও সহজ কর ব্যবস্থা নয়। এটি এমন এক গোলকধাঁধা, যেখানে কেবল ক্ষমতাশালীরাই পালানোর পথ জানে, আর সৎ করদাতারা কেবল মাশুল গুনে যান। অখিলেশ জি আমার আগে বক্তব্য রেখেছেন এবং উত্তরপ্রদেশ কী পেয়েছে সেই প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ অর্থমন্ত্রীর ৮৫ মিনিটের বক্তৃতায় একবারের জন্যও বাংলার উল্লেখ ছিল না।

এমনকি এই বাজেটে ডানকুনি থেকে যে ফ্রেট করিডোরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি আসলে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, যিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।সংবিধান রাজ্যগুলোর মধ্যে সমতার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু এই সরকার পক্ষপাতের রাজনীতি করে। যেখানে শরিকদের তহবিল দেওয়া হয় আর বিরোধীদের ভাতে মারা হয়। এটি সহযোগীমূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনও মডেল নয়, বরং এটি হল এক ধরনের ‘সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা’। এই বাজেট এবং সরকার যেভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আমাদের এমন এক সত্যের মুখোমুখি হতে বাধ্য করছে, যা আমরা নাগরিক হিসেবে এড়িয়ে চলছি। ২০২১ সালে, বীর দাস ‘দুই ভারতের’ কথা বলেছিলেন। অনেকে হাসাহাসি করলেও তা ছিল আসলে একটি ভবিষ্যদ্বাণী। কারণ আমি সেই দুই ভারত থেকেই এসেছি। সেই ভারত যে ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’ বলে দাবি করে, আবার আমি এমন এক ভারত থেকেও এসেছি যেখানে মাতৃভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্দেহের প্রতীক। যেখানে বাংলা ভাষায় কথা বললে আপনাকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়া হয়, আর মাছ খেলে আপনাকে বলা হয় ‘মোঘল’। বাংলা ভাষায় কথা বললে কি আপনি বাংলাদেশি হয়ে যান? মাছ খেলে কি আপনি মোঘল হয়ে যান?
স্যার, আমি ভারতের এমন এক প্রান্ত থেকে এসেছি, যে মাটি অনেক বিপ্লবীর জন্ম দিয়েছে, যেখানে আমাদের রক্তে সাহস বহমান। আবার আমি এমন এক ভারত থেকেও এসেছি যেখানে ‘জয় বাংলা’ বলা বা ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া আপনাকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমি এমন এক ভারত থেকে এসেছি যা ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ বলে স্লোগান তোলে, আবার আমি এমন এক ভারত থেকেও এসেছি। যেখানে পশ্চিমবঙ্গের ১,৯৬,০০০ কোটি টাকার ন্যায্য পাওনা অন্যায় ভাবে আটকে রাখা হয়েছে। এটি কেবল টাকার লড়াই নয়। যা আটকে রাখা হয়েছে তা হল সম্মান এবং প্রতিটি রাজ্যের প্রতি সমান আচরণের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি। আমি এমন এক ভারত থেকে এসেছি, যেখানে অর্থমন্ত্রী সগর্বে ঘোষণা করেন যে, ভারতীয় অর্থনীতির উত্থান গোটা বিশ্বে দ্রুততম।

আবার আমি এমন এক ভারত থেকেও এসেছি, যেখানে গত সাত বছরে ৬.৫ লক্ষ কোটি টাকা কর দেওয়ার পরেও বাংলাকে তার ন্যায্য বকেয়া থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বারবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও MNREGA-র টাকা আটকে দেওয়া হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ঘর বন্ধ করা হয়েছে, গ্রাম সড়ক যোজনার রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছে, এমনকি জল জীবন মিশনের পানীয় জলের মতো মৌলিক সুবিধাও স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি এমন এক ভারত থেকে এসেছি যারা ‘ম্যাক্সিমাম গভর্ন্যান্স, মিনিমাম গভর্নমেন্ট’-এর বড়াই করে। আমি আবার এমন এক ভারত থেকেও এসেছি যেখানে সুশাসনের অর্থ হল সাধারণ মানুষকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া; আবার আমি এমন এক ভারত থেকেও এসেছি, যেখানে হতদরিদ্র মানুষকে একটা রুটি, একটা কাপড় আর মাথার উপর একটা ছাদের জন্যও লড়াই করতে হয়। যেখানে শ্রমিকের মজুরি আটকে করে রাখা হয় এবং যেখানে ঘর পাওয়ার স্বপ্ন কাগজে-কলমে অনুমোদন পেলেও বাস্তবে তার কোনও অস্তিত্ব নেই। আমি এমন এক ভারত থেকে এসেছি যেখানে কৃষকদের আটকাতে দেশের রাজধানীতে ব্যারিকেড আর রাস্তায় পেরেক পুঁতে দেওয়া হয়। আমি আবার এমন এক ভারত থেকেও এসেছি যেখানে সন্ত্রাসবাদীরা অনায়াসেই ঢুকে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে এবং ১৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। আমি এমন এক ভারত থেকে এসেছি যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে দেশের সীমান্ত নিরাপদ, অথচ তা সত্ত্বেও সন্ত্রাসবাদীরা অনুপ্রবেশ করে দিনের আলোয় ২৬ জন নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে। এই যে পরিত্যাগ, ভাঙা প্রতিশ্রুতি এবং বেছে বেছে নিষ্ঠুরতা-এই সবকিছুই আকস্মিক নয়। এই বাজেটের একটি বিশেষ নীতি থেকেই এগুলো প্রবাহিত হচ্ছে।


আধুনিক ভারত তিনটি ধ্রুব সত্য নিয়ে বেঁচে আছে: ক্রমবর্ধমান চাপ, বহুমুখী কর এবং বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা। আজ ভারত ট্রিপল চাপ, ট্রিপল কর এবং ট্রিপল প্রতারণার শিকার। আমি এই কক্ষের সামনে আমার সেই ‘ট্রিপল’ নীতিগুলি তুলে ধরতে চাই। ট্রিপল ট্যাক্সের ফাঁদ, একজন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন যে তিনি কেবল একবার কর দেন, কিন্তু বাস্তবে তাঁকে তিনবার কর দিতে হয়। প্রথমত, ইনকাম ট্যাক্স, যা বেতন হাতে আসার আগেই কেটে নেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, জিএসটি বিস্কুট থেকে নোটবই, চিনি থেকে মশলা, বিদ্যুৎ বিল থেকে চিকিৎসার খরচ; পরোক্ষ কর আপনাকে সব জায়গায় তাড়া করে বেড়ায়। সরকার রেকর্ড জিএসটি সংগ্রহের উৎসব পালন করে, কিন্তু এটি সমৃদ্ধির প্রতিফলন নয়। এটি আসলে মানুষের প্রয়োজনীয় খরচ থেকে নিংড়ে নেওয়া রাজস্ব। আর তৃতীয়টি হল মুদ্রাস্ফীতি,* যা সবচেয়ে নিঃশব্দ কর। এটি এমন এক কর যা অনুমতি ছাড়াই বাড়ে এবং কোনও দায়িত্ব ছাড়াই আদায় করা হয়। এটি সাধারণ মানুষের পকেটে হওয়া একটি নীরব ফুটো। মধ্যবিত্তের কাছে মুদ্রাস্ফীতি মানে হল বেতন সময়মতো আসে কিন্তু মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যায়। বাড়তি কিছু কেনা হয় না, অথচ টাকা দ্রুত শেষ হয়ে যায়, যা সঞ্চয়কে তিলে তিলে গিলে ফেলে। আমি এমন এক ভারত থেকে এসেছি যা নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ বলে দাবি করে। আমি আবার এমন এক ভারত থেকেও এসেছি যা বিশ্বকে দেখায়, কীভাবে একজন নাগরিকের থেকে তিনবার কর আদায় করতে হয়। দ্বিতীয়ত, নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে আজ তিনগুন যন্ত্রণা পেতে হচ্ছে। আজ শুধু ভোট দেওয়াই যথেষ্ট নয়। দশকের পর দশক ভোটার তালিকায় নাম থাকাও যথেষ্ট নয়। এমনকি দেশের সেবা করাও আজ যথেষ্ট বলে গণ্য হচ্ছে না। আপনি একজন সৈনিক হতে পারেন, নোবেলজয়ী হতে পারেন, দায়িত্বরত হাইকোর্টের বিচারপতি বা এই সভার সদস্যও হতে পারেন, তবুও আপনাকে প্রমাণ করতে বলা হতে পারে যে আপনি এই দেশেরই মানুষ। এটি সংবিধানের আর্টিকেল ৩২৬ লঙ্ঘন করে, যা প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করে। শুধুমাত্র বাংলাতেই গত কয়েক মাসে ১৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রায় এক কোটি মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি ভোটার তালিকা এতটাই অবিশ্বাস্য হয় যে প্রত্যেক নাগরিককে বারবার নিজের বৈধতা প্রমাণ করতে হয়, তবে এই কক্ষের বৈধতা নিয়েও তো প্রশ্ন উঠে যায়।


বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তলানিতে ঠেকেছে, অথচ সাধারণ মানুষকে কোনও স্বস্তি দেওয়া হয়নি । উল্টে মানুষকে বেশি দামে ইথানল মেশানো পেট্রোল নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। মানুষ এমন এক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছে, যা তাঁরা চাননি এবং যার থেকে তাঁদের কোনও লাভও হচ্ছে না। আমার দ্বিতীয় বিষয়বস্তু: সরকার বুলেট ট্রেন নিয়ে গর্ব করে, কিন্তু রেললাইনের মাত্র ৪ শতাংশ ‘কবচ’ সুরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত। সাধারণ যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে।
তৃতীয় বিষয়বস্তু: সাধারণ ভারতীয়রা কোনও মিরাকেল চায় না। তাঁরা শুধু শুদ্ধ বাতাস, স্বচ্ছ জল, নিরাপদ রাস্তা এবং সুলভ চিকিৎসার আশা করে। এমনকি মানুষের এই মৌলিক আশাগুলো আজ অনিশ্চিত। একজন ব্যক্তি যিনি আগে থেকেই আয়কর Income Tax দেন, তাঁকে রাস্তায় গাড়ি চালাতে গেলে তিনটি কর দিতে হয়, Income Tax, রোড ট্যাক্স এবং টোল ট্যাক্স। একবার যাত্রার জন্য তিনবার পেমেন্ট। এই বাজেট একটি নির্দিষ্ট ধরণ প্রকাশ করে। প্রথমত, এটি ধনীদের জন্য এক ‘ট্রিপল বোনানজা’ এবং গরিবদের জন্য ‘ট্রিপল লক’। বর্তমানে দেশের উপরের সারির ১০ শতাংশ মানুষ দেশের আয়ের ৫৭ শতাংশ এবং সম্পদের ৬৫ শতাংশ ভোগ করছে, অন্যদিকে নীচের সারির অর্ধেক মানুষ মাত্র ৬.৪ শতাংশের উপর বেঁচে আছে।
দ্বিতীয়ত, বিদেশি ক্লাউড সংস্থাগুলোকে কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড MSMEগুলো খালি হাতে ফিরছে। স্বস্তি বা সুবিধা শুধু কাগজেই আছে, বাস্তবে আছে চরম দুর্দশা।
তৃতীয়ত, কর্পোরেট ইন্ডিয়াকে রেড কার্পেটে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, সহজ সম্পত্তি আইন, NRI-দের জন্য শেয়ার বাজারে বাড়তি সুবিধা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের বিশাল প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর ফল প্রতিযোগিতা নয়, বরং একচেটিয়াকরণ। মুষ্টিমেয় কিছু বড় সংস্থা ফুলেফেঁপে উঠছে, নতুনদের ব্যবসায় আসা কঠিন হয়ে পড়ছে, সাধারণ উদ্যোক্তারা ছিটকে যাচ্ছেন এবং সরকারের মদতে কিছু ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতি আরও ধনী হচ্ছে।
আমি এমন এক ভারতের প্রতিনিধি যেখানে সম্পদকে গুণ হিসেবে দেখা হয়, আবার আমি এমন এক ভারতেরও প্রতিনিধি যেখানে শুধু বেঁচে থাকাটাই একটা বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন কৃষক আত্মহত্যা করছেন কারণ সরকারি নীতিগুলো তাদের সুবিধা দিতে ব্যর্থ। ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের ৫ বছর পরেও, যেখানে ৭০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার এখনও MSPকে আইনি স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও প্রতিবাদস্থলে এবং সংসদে তারা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ক্ষতে নুনের ছিটে দিয়ে সরকার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এমন এক চুক্তি করেছে যা ভর্তুকিযুক্ত আমেরিকান কৃষি পণ্যের জন্য ভারতের বাজার খুলে দিচ্ছে। এটি আমেরিকান কৃষকদের লাভবান করলেও ভারতের কৃষকদের ক্ষেত্রে বাজারে দাম কমিয়ে দেবে, প্রতিযোগিতা নষ্ট করবে এবং তাঁদের আরও কোণঠাসা করবে। এটি আমাদের ‘অন্নদাতা’দের পরিত্যাগ করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
মার্কিন কৃষি সচিব ব্রুক রলিন্স জানিয়েছেন যে, এই নতুন ইউএস-ইন্ডিয়া চুক্তির ফলে ভারতের বিশাল বাজারে আরও বেশি আমেরিকান কৃষিপণ্য রপ্তানি করা হবে। তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার কৃষি বাণিজ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল এবং এই চুক্তি সেই ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে। এগুলো আমার কথা নয়, তাঁর প্রকাশ্য বিবৃতি। আমাদের সরকার যদি এর সাথে একমত না হয়, তবে প্রতিবাদ কোথায়? এই নীরবতাই সব বলে দিচ্ছে।


এবার আমি যুবসমাজের কথায় আসি। বহুল প্রচারিত ‘পিএম ইন্টার্নশিপ স্কিম’-এর জন্য ১০,৮০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করা হয়েছিল, কিন্তু তার ৫ শতাংশের কম খরচ করা হয়েছে। একইভাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ‘পিএম ইয়াং অ্যাচিভার্স স্কলারশিপ’-এর ৩১ শতাংশ তহবিল অব্যবহৃত রয়ে গেছে।
এই দেশে প্রতিদিন ৮৬ জনের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন- যা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার প্রতিফলন। বাংলা কঠোর শাস্তির বিধান রেখে ‘অপরাজিতা বিল’ পাস করেছে, যাতে অপরাধীদের মনে ভয় সৃষ্টি করা যায়। বিলটা রাজ্যপালের মাধ্যমে যথাসময়ে কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়েছে, তবুও দেড় বছর ধরে এটা ঝুলে আছে। এটা সদিচ্ছার অভাবকেই তুলে করে।
গত এক দশকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখন আর তদন্ত করে না; তারা কেবল বিরোধীদের লক্ষ্য করে ভয় দেখায়। আমি এমন এক ভারত থেকে এসেছি যেখানে “বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও” স্লোগান দেওয়া হয়, আবার আমি এমন এক ভারতের প্রতিনিধি যেখানে প্রতি ১৬ মিনিটে নারীদের বিরুদ্ধে একটি করে অপরাধের খবর নথিভুক্ত হয়।
ঘৃণা ছড়ানো এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শত্রুতা তৈরির মামলা ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে; এর পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক জনসভা এবং সুপরিকল্পিত পরোক্ষ উস্কানি। যখন ঘৃণা ছড়িয়েও পার পাওয়া যায়, তখন তা আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং সংখ্যালঘুদের এর মাশুল দিতে হয়। ঘৃণা এখন এক ধরণের বিজ্ঞাপনে পরিণত হয়েছে। এক বছরেই ১৩,০০০-এর বেশি উস্কানিমূলক বক্তব্য নথিভুক্ত হয়েছে। সরকারের নীরবতা একটা স্পষ্ট বার্তা দেয়: ভয় দেখানো সহ্য করা হচ্ছে।
আমি এমন এক ভারত থেকে এসেছি, যেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন “না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা”, আবার আমি এমন এক ভারতেরও প্রতিনিধি যেখানে বিজেপিতে যোগ দেওয়া ২৫ জন নেতার মধ্যে ২৩ জনকে রেহাই দেওয়া। সেই ‘ওয়াশিং মেশিন’ নিয়ে প্রশ্ন তুললে আপনাকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া হয়।
কৃষিক্ষেত্রে, বাজেট MSP-এর নিশ্চয়তা এবং ফসল সংগ্রহ বৃদ্ধির বিষয়ে কোন‌ও কথা নেই। মূল্য স্থিতিকরণ তহবিল, ডিজেল সহায়তা, সার ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি নিয়ে কোনও ঘোষণা নেই। ইনপুট খরচ এবং ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়া সত্ত্বেও ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ‘পিএম-কিষাণ’ নিধি সেই ৬,০০০ টাকাতেই আটকে আছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে কৃষকদের আয় প্রতি বছর কমছে।
স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় GDP-এর ০.২৬ শতাংশের‌ও নিচে। জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২.৫ শতাংশের প্রতিশ্রুতি দিলেও, আমরা তার বদলে পাচ্ছি কেবল অজুহাত আর সময় পিছিয়ে দেওয়া। যে দেশে অসুস্থতা হল দারিদ্র্যের সবথেকে দ্রুততম পথ, সেখানে সরকার সেবার চেয়ে কেবল বড় বড় ঘোষণার উপরই বেশি জোর দিচ্ছে।
স্মার্ট সিটি মিশনের আওতায় ২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি খরচ করে ১০০টি শহরের ভোল বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এক দশক পরে আমাদের হাতে আছে আধা-নির্মিত বাড়ি আর আসামাপ্ত উন্নয়ন। জল জীবন মিশনের অধীনে বরাদ্দ ৭৪ শতাংশ কমানো হয়েছে, আর সেই বোঝা রাজ্যগুলোর উপর বাড়তি চাপিয়ে দিয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্টের জন্য ৫৫,০০০ কোটি টাকা খরচ হলেও পরিকাঠামোর জন্য মাত্র ২.৬৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে- যা একটা বিশ্বমানের গবেষণাগার তৈরির জন্যও যথেষ্ট নয়।
RTI আইনকে দুর্বল করা হয়েছে। পিএম কেয়ার্স ফান্ডকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। NFHS-এর তথ্য প্রকাশ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো এখনও ২০১১ সালের জনশুমারির উপর ভিত্তি করে চলছে।
ডঃ আম্বেদকর আমাদের সতর্ক করেছিলেন- গণতন্ত্র কেবল প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি সাংবিধানিক নৈতিকতার বিষয়। গান্ধীজি শিখিয়েছিলেন নৈতিকতা বিবর্জিত অর্থনীতি হল এক ধরণের হিংসা। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, দুর্বলকে পিষ্ট করে কোনও জাতি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। এই বাজেট এই তিনটি নীতিকেই লঙ্ঘন করেছে।
আজকের ভারতে, কর ব্যবস্থা শুধু আপনার আয়ের উপর নয়, আপনার পুরো জীবনের উপর থাবা বসিয়েছে। একটি শিশু জন্মালে তার বেবি পাউডার আর ডায়াপারে কর; বড় হলে তার শিক্ষার ওপর কর। যখন সে রোজগার শুরু করে তখন আয়কর, আর যখন টাকা জমায়, তাতেও কর। অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচে কর, আর বৃদ্ধ বয়সে পেনশনেও কর। এমনকি মৃত্যুর পর শোকসভায় জ্বালানো ধূপকাঠিতেও কর দিতে হয়। এটাই হল এই বাজেটের সারাংশ।
এগুলো কোনও সংস্কার নয়, এ হল আজীবন করের এক মরণফাঁদ।
২০১৬, ২০২১ এবং ২০২৪, পরপর তিনটে নির্বাচনে বাংলায় বিজেপি হেরেছে। তিনটে রায়, তিনটেই চূড়ান্ত পরাজয়। চতুর্থটা আর সতর্কবার্তা নয়, এটা দ্রুত ঘনিয়ে আসছে।
এই সরকার বাংলাকে শাস্তি দিতে চায়। আপনারা আমাদের তহবিল আটকে রাখতে চান, কিন্তু আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। আপনারা আমাদের সমস্ত প্রকল্পের টাকা আটকে রেখেছেন, কিন্তু আমরা দেখিয়ে দিয়েছি স্বনির্ভর বাংলা কেমন করে তৈরি হয়।
ফাইল চাপা দেওয়া যায়, তহবিল আটকে রাখা যায়, কণ্ঠস্বর রোধ করা যায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না। আর যখন মানুষ জেগে উঠবে এবং ব্যালটে তার জবাব দেবে, তখন আমরা শেষ হিসেবটা চুকিয়ে নেব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *