পায়ে কি বিদ্যুতের ঝটকা বা জ্বালাপোড়া অনুভব করছেন? অবহেলা করলে পঙ্গুত্বের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ‘নিউরোপ্যাথি’

শরীরের ভেতরেই যেন বয়ে চলেছে বৈদ্যুতিক প্রবাহ, কখনো সুঁচ ফোটার মতো তীব্র যন্ত্রণা, আবার কখনো পা একদম অবশ— এই লক্ষণগুলো কি আপনার খুব চেনা? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে সাবধান! আপনি হয়তো ‘নিউরোপ্যাথি’ নামক এক জটিল স্নায়বিক রোগের শিকার হচ্ছেন। আধুনিক জীবনযাত্রায় এই রোগটি নিঃশব্দে থাবা বসাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের শরীরে। সাধারণত স্নায়ু বা নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলেই এই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমাদের শরীরের স্নায়ুগুলো মূলত মস্তিষ্ক থেকে সংকেত বয়ে নিয়ে যায় হাত, পা, হৃদপিণ্ড এবং অন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে। যখন এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে, তখনই শুরু হয় আসল সমস্যা।
স্নায়ু কীভাবে কাজ করে এবং কেন এই বিপত্তি?
আমাদের শরীরে প্রধানত তিন ধরনের স্নায়ু কাজ করে, যা আমাদের বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তকে নিয়ন্ত্রণ করে:
- সেন্সরি নার্ভ (Sensory): স্পর্শ, ব্যথা, তাপ এবং ঠান্ডার অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে।
- মোটর নার্ভ (Motor): হাত ও পায়ের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে।
- অটোনমিক নার্ভ (Autonomic): হৃদস্পন্দন, হজম প্রক্রিয়া এবং ঘাম নিঃসরণের মতো অনিচ্ছাকৃত কাজগুলো পরিচালনা করে।
যখন এই স্নায়ুগুলো প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বা পুষ্টি পায় না, তখনই নিউরোপ্যাথির লক্ষণ দেখা দেয়। এই রোগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ভিটামিন বি-১২ (B12) এর অভাব, অতিরিক্ত মদ্যপান, থাইরয়েডের সমস্যা এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
নিউরোপ্যাথির ধরণ ও ভয়াবহতা
নিউরোপ্যাথি কেবল এক প্রকারের নয়, এটি শরীরের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রভাব ফেলে:
১. পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি: এটি সবথেকে সাধারণ। এতে হাত ও পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরা, জ্বালাপোড়া বা অবশ ভাব দেখা দেয়।
২. অটোনমিক নিউরোপ্যাথি: এটি সরাসরি হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন, কোষ্ঠকাঠিন্য বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যা তৈরি করে।
৩. ফোকাল নিউরোপ্যাথি: শরীরের কোনো একটি নির্দিষ্ট স্নায়ু (যেমন চোখের বা মুখের নার্ভ) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
৪. ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি: মূলত সুগার রোগীদের ক্ষেত্রে এটি দেখা যায়। এর ফলে পায়ে ঘা হওয়া বা স্পর্শ অনুভূতি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
প্রতিকার ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
নিউরোপ্যাথিকে পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হলেও সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, রক্তে শর্করার মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এই লড়াইয়ের প্রথম ধাপ। এছাড়া খাদ্যতালিকায় ভিটামিন বি-১২ সমৃদ্ধ খাবার যেমন দুধ, ডিম ও সবুজ শাকসবজি রাখা জরুরি। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে স্নায়ুর কার্যক্ষমতা সচল রাখা যায়। মনে রাখবেন, পায়ের সামান্য ঝিঁঝিঁ ধরা বা জ্বালাপোড়াকে অবহেলা করলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের শারীরিক অক্ষমতার কারণ হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।