ইস্তফা দিলেও আটকে রাখা কি এখন ‘ক্রীতদাস প্রথা’? কেরালা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় শোরগোল ফেলল দেশজুড়ে

ইস্তফা দিলেও আটকে রাখা কি এখন ‘ক্রীতদাস প্রথা’? কেরালা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় শোরগোল ফেলল দেশজুড়ে

চাকরিতে ইস্তফা দেওয়ার পরেও কি কোনো সংস্থাকে কর্মীর ওপর জোর খাটাতে পারে? নিয়োগকর্তা কি চাইলে আটকে রাখতে পারেন পদত্যাগপত্র? সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর মামলার প্রেক্ষিতে কেরালা হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে, তা কার্যত দেশের সমস্ত চাকরিজীবী এবং নিয়োগকর্তাদের জন্য এক বিরাট বার্তা। বিচারপতি এন নাগরেশ স্পষ্ট জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কারণ বা গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছাড়া কোনো কর্মীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করা সংবিধানের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং এটি প্রকারান্তরে ‘বন্ডেড লেবার’ বা দাস-শ্রমিক প্রথারই নামান্তর।

মামলার প্রেক্ষাপট এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ

এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বা পিএসইউ (PSU)-এর কো ম্পা নি সেক্রেটারি নিজের ব্যক্তিগত কারণে ইস্তফা জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সংস্থাটি তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং উল্টে তাঁকে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ অমান্য করায় ওই কর্মীকে শো-কজ নোটিসও পাঠানো হয়। সেই নোটিসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। জানা যায়, ২০২০ সালে বাবার মৃত্যুর পর অসুস্থ মায়ের দেখভালের জন্য তিনি চাকরি ছাড়তে চেয়েছিলেন। এমনকি ২০২২ সাল থেকে তাঁকে বেতনও দেওয়া হচ্ছিল না।

সংস্থার যুক্তি ছিল, তাদের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হওয়ার কারণেই তারা দক্ষ কর্মীকে ছাড়তে চাইছে না। কিন্তু আদালত এই যুক্তি নস্যাৎ করে দিয়েছে। বিচারপতি জানান, কোনো সংস্থার আর্থিক সংকট কখনোই কোনো ব্যক্তিকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করার অজুহাত হতে পারে না। যদি নিয়োগ চুক্তিতে নোটিস পিরিয়ড সংক্রান্ত কোনো বড় আইনি বাধা না থাকে বা কর্মীর বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর আর্থিক তছরুপের তদন্ত না চলে, তবে নিয়োগকর্তা পদত্যাগপত্র আটকে রাখতে পারেন না।

কেন এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?

কেরালা হাইকোর্ট মনে করিয়ে দিয়েছে যে, একজন নাগরিকের পেশা বেছে নেওয়ার বা ত্যাগ করার অধিকার ভারতের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। আদালত সাফ জানিয়েছে—

  • ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করানো দণ্ডনীয়: কোনো কর্মীকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা মানে তাঁকে আধুনিক যুগের ‘বন্ডেড লেবার’ হিসেবে গণ্য করা।
  • রিলিজ লেটারের গুরুত্ব: আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, পুরনো সংস্থা থেকে সঠিক ছাড়পত্র বা রিলিজ লেটার না পেলে একজন যোগ্য কর্মী অন্য কোথাও ভালো চাকরির সুযোগ পাবেন না। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে পদত্যাগপত্র আটকে রাখা আসলে সেই কর্মীর জীবনধারণের অধিকার কেড়ে নেওয়ার শামিল।
  • শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সীমা: পদত্যাগ করার অধিকার রুখতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয় দেখানো বা শো-কজ নোটিস পাঠানোকে আদালত অধিকার লঙ্ঘনের প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছে।

আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ

বিচারপতি এন নাগরেশ ওই সংস্থাকে অবিলম্বে আবেদনকারীর ইস্তফাপত্র গ্রহণ করে তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বকেয়া বেতন এবং আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দ্রুত মিটিয়ে দেওয়ার জন্য কড়া নির্দেশ জারি করেছে আদালত। এই রায়ের ফলে বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত— উভয় ক্ষেত্রেই নিয়োগকর্তাদের একতরফা আধিপত্যে বড়সড় ধাক্কা লাগল বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *