বাম জমানার অবসান: রাজনৈতিক ছানি ও পতনের নেপথ্য কাহিনী

পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান কেবল নন্দীগ্রামের রক্তাক্ত অধ্যায়ের ফল ছিল না, বরং এর শিকড় ছিল অনেক গভীরে। ষাটের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুক্তফ্রন্ট সরকারের উত্থান-পতন এবং সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকেই বাংলায় হিংসার রাজনীতির সূত্রপাত। জ্যোতি বসুর দীর্ঘ শাসনামলে শান্তি ও শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, বাস্তবে রাজনৈতিক খুনের সংস্কৃতি থামেনি। বরং আনন্দমার্গী হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিজন সেতুর নৃশংসতা—একের পর এক ঘটনাপ্রবাহে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে সাময়িক উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল নেওয়া হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই রিপোর্ট আর আলোর মুখ দেখেনি।
সময়ের সাথে সাথে বামপন্থীদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় যেন ‘ছানি’ পড়েছিল। যে কংগ্রেস একদা ‘গণতন্ত্র হত্যার’ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল, পরবর্তীকালে বাম জমানাতেও সেই একই রিগিং ও পেশ পেশিশক্তির আস্ফালনের অভিযোগ ওঠে। পুলিশের দলীয়করণ এবং প্রশাসনের অন্দরে দুর্নীতির অনুপ্রবেশ শাসনব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিয়েছিল। সিঙ্গুরে শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখিয়ে যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যাত্রা শুরু করেছিলেন, নন্দীগ্রামের গুলিচালনা তাকে ইতিহাসের এক ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়। দেওয়াল লিখন পড়তে না পারার এই ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত বাংলায় বাম সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করেছিল।