আর জি কর কাণ্ডের অজুহাতে দেড় বছর বন্ধ সিসিইউ, নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্র, অনুমতি দিতে সিবিআইয়ের গড়িমসি, চরম রোগী দুর্ভোগ

রাজারহাটের সবুরা বিবির পরিবার হাত-পা ছড়িয়ে সবে খিচুড়ি খেতে বসেছে। পরিবারের বাচ্চা মেয়ের ফুসফুসে জল জমেছে। টেনশনে টেনশনে কাটছে রাতদিন। ডাক্তাররা চেষ্টার কসুর করছেন না।
লম্বা উঠে গিয়েছে র্যাম্প। আর জি কর মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সিতে আশঙ্কাজনক রোগীদের স্ট্রেচারে নিয়ে ওঠার জন্য ব্যবহৃত হত এটি। ২০২৪ সালের আগস্টের আগে কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত র্যাম্প ছিল এটি। অভয়া কাণ্ড পরবর্তী সময়ে, ওই বছর ১৫ আগস্ট গভীর রাতে কয়েকশো দুষ্কৃতী এই র্যাম্প দিয়ে উঠেই তছনছ করে দিয়েছিল ইমার্জেন্সি, হাইব্রিড সিসিইউ। তারপর কেটে গিয়েছে দেড়টা বছর। ভাঙচুরের তদন্ত করছে সিবিআই। কিন্তু সেই তদন্ত কবে শেষ হবে, কেউ জানে না! সেই যে ইমার্জেন্সিতে তালা পড়েছে, খোলেনি এখনও। হাসপাতালের তরফে বহুবার তা খুলে দেওয়ার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সিবিআইয়ের লিখিত অনুমতি মেলেনি বলেই দাবি হাসপাতালের মেডিকেল সুপার ও উপাধ্যক্ষ ডাঃ সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়ের। সিবিআই জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থেই বন্ধ রাখা হয়েছে ইমার্জেন্সি।
মঙ্গলবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, ইমার্জেন্সি শুধু বন্ধ বললে সবটা বলা হয় না! গোটা র্যাম্প কার্যত বদলে গিয়েছে রোগীর বাড়ির লোকজনের বিশ্রাম ও তাঁদের কাপড়চোপড় রাখার জায়গায়। বন্ধ কোলাপসিবল গেটের উপর ভাঙচুর হওয়া গ্লো সাইন বোর্ডটি যেমন ছিল, তেমনই রয়েছে। তার নীচে রোগীর বাড়ির লোকজন শুয়েবসে সময় কাটাচ্ছেন। মাথার উপর পলিথিন। সবুরা বিবির মতো অনেকেই সেখানে সেরে নিচ্ছেন ‘লাঞ্চ’।
তদন্তের জন্য ইমার্জেন্সি বন্ধ থাকায় আর জি করের অস্থায়ী ইমার্জেন্সি চালু হয় ট্রমা কেয়ার সেন্টারে। ঝাঁপ, ট্রেনে কাটা বা পথ দুর্ঘটনায় জখমদের পাশাপাশি সেখানেই আনা হচ্ছে অন্যান্য আশঙ্কাজনক রোগীদের। তুমুল ভিড়। পুলিশ, সিআইএসএফের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। বসিরহাটের বিশ্বজিৎ বিশ্বাসের মায়ের স্ট্রোকের চিকিৎসা চলছে। বিশ্বজিৎ বললেন, ‘দেড় বছর তো হল। এবার তো চালু করুক ইমার্জেন্সি।’
দেড় বছর ধরে শুধু মেইন ইমার্জেন্সিই বন্ধ নেই, তালাবন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে অর্থোপেডিক অপারেশন থিয়েটারের স্টোররুমও। সেখানে থাকা বহুমূল্য যন্ত্রপাতি রোগীদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিভাগীয় চিকিৎসকদের আশঙ্কা, সম্ভবত নষ্টই হয়ে গিয়েছে কোটি টাকার আর্থোস্কোপ মেশিন, অত্যাধুনিক অটোক্লেভ মেশিন, হাড় কাটার বহুমূল্য ছুরি। অর্থোপেডিকের প্রধান ডাঃ এস কুমার বললেন, ‘আটতলার ওই ঘর তালাবন্ধ থাকায় দেড় বছর ধরে এসব যন্ত্র স্পর্শই করতে পারেননি আমার বিভাগের চিকিৎসকরা।’
অভয়া কাণ্ডের আগে আর জি করের ইমার্জেন্সি ঢেলে সেজেছিল রাজ্য। কয়েক কোটি টাকা খরচে তৈরি হয় ১৫ বেডের হাইব্রিড ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ)। ইমার্জেন্সির লম্বা করিডরে তারই একপাশে ছিল অবজারভেশন ওয়ার্ড। শহরের অন্যতম বড় (১০০ বেড) ইমার্জেন্সি বিভাগ। সেই ইমার্জেন্সি সারানোর জো নেই এখন!