নির্বাচন কমিশন নয় যেন টর্চার কমিশন, ভোটার তালিকা থেকে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ নিয়ে রণংদেহি মমতা

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নজিরবিহীন তোপ দাগলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কমিশনের কাজ কর্মকে ‘তুঘলকি শাসন’ এবং ‘হিটলারি আচরণ’ এর সঙ্গে তুলনা করে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাংলার গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বুলডোজার দিয়ে পিষে ফেলার চেষ্টা চলছে। শুক্রবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে কমিশনের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন তৃণমূল নেত্রী।
ভোটার তালিকায় ‘বিশাল জালিয়াতি’ ও দিল্লির জমিদারদের নির্দেশ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সদস্যের মতো আচরণ করছে এবং নির্বাচনের আগে বিজেপিকে অন্যায্য সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “জনগণই তো সরকার নির্বাচন করে, নাকি এই তুঘলকি কমিশন ঠিক করে দেবে কারা ক্ষমতায় আসবে?” তাঁর দাবি, আইটি সেল এবং এআই (AI) ব্যবহার করে প্রায় ৫৮ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সিংহভাগই সংখ্যালঘু, দরিদ্র এবং তফশিলি জাতি-জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ।
বিহারে যা গ্রাহ্য বাংলায় কেন নয়
মুখ্যমন্ত্রী তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন তোলেন যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) ক্ষেত্রে বিহার, হরিয়ানা বা মহারাষ্ট্রে যে নথিগুলো বৈধ বলে গণ্য হচ্ছে, বাংলায় কেন সেগুলো বাতিল করা হচ্ছে? তিনি বলেন, “বিহারে রেশন কার্ড, ফ্যামিলি রেজিস্টার বা পঞ্চায়েতের দেওয়া শংসাপত্র গ্রাহ্য হলে বাংলায় কেন হবে না? বাংলাকে কেন আলাদা করে নিশানা করা হচ্ছে?” তাঁর মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে জটিলতা তৈরি করে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য ও লগ-ইন ব্লক
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি ছিল সময়সীমা নিয়ে। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী ১৪ ফেব্রুয়ারি শুনানির শেষ দিন থাকলেও, ওইদিন বিকেল ৩টের পরেই কমিশনের পোর্টাল বা লগ-ইন ব্লক করে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন মমতা। এর ফলে প্রায় এক লক্ষ মানুষ নিজেদের নথি আপলোড করতে পারেননি। মুখ্যমন্ত্রী একে ‘বেআইনি’ এবং ‘আদালত অবমাননা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইআরও এবং বিএলও-দের ওপর মানসিক নির্যাতন
কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে সরব হয়ে মমতা জানান, হোয়াটসঅ্যাপে একের পর এক স্ববিরোধী নির্দেশ পাঠিয়ে জেলা স্তরের আধিকারিকদের (ERO) বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। বিনা কারণে আধিকারিকদের সাসপেন্ড করে একটি ‘থ্রেট কালচার’ বা হুমকির সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। এমনকি, কাজের চাপে ও অত্যাচারে ১৬০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বিএলও-রা (BLO) তাঁদের সুইসাইড নোটে সরাসরি কমিশনকে দায়ী করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
২০২৬ সালে কেন্দ্রের পতন নিশ্চিত
কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মনে করছেন তাঁর চেয়ার চিরস্থায়ী। কিন্তু মনে রাখবেন, ২০২৬ সালের পর এই কেন্দ্রীয় সরকারের পতন নিশ্চিত।” তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস সংবিধান ও সৌজন্যে বিশ্বাস করে বলেই এতদিন চুপ ছিল, কিন্তু মানুষের অধিকার কেড়ে নিলে তিনি পাল্টা আঘাত করতে দ্বিধা করবেন না। সাধারণ মানুষ এই ‘তুঘলকি কমিশন’কে মাঠের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।