‘আমাকে তিন তালাক দিয়েছে সিপিএম’, মহম্মদ সেলিমকে বেনজির আক্রমণ শানিয়ে বিস্ফোরক প্রতীক উর

‘আমাকে তিন তালাক দিয়েছে সিপিএম’, মহম্মদ সেলিমকে বেনজির আক্রমণ শানিয়ে বিস্ফোরক প্রতীক উর

কলকাতা: বঙ্গ সিপিএমের অন্দরে বিদ্রোহের আগুন এবার দাবানলের আকার নিচ্ছে। লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ডহারবার কেন্দ্রের প্রার্থী তথা দলের তরুণ তুর্কি প্রতীক উর রহমানের সাম্প্রতিক মন্তব্য আলিমুদ্দিনের অন্দরে রীতিমতো কম্পন ধরিয়ে দিয়েছে। বুধবার রাতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি সরাসরি তোপ দেগেছেন রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে। তাঁর সাফ কথা, “সিপিএম আমাকে তিন তালাক দিয়েছে।” আর এই মন্তব্যের পরেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তবে কি এবার লাল পতাকা ছেড়ে ঘাসফুলে পা বাড়াতে চলেছেন এই সংখ্যালঘু নেতা?

বিমান বসুর ফোন ও প্রতীকের অনড় অবস্থান

দলের অন্দরে প্রতীকের ক্ষোভ প্রশমিত করতে খোদ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু উদ্যোগী হয়েছিলেন। সূত্রের খবর, বুধবার বিকেলে একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন যায় প্রতীকের কাছে। ওপার থেকে জানানো হয়, বিমান বসু তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। বর্ষীয়ান নেতা তাঁকে আলিমুদ্দিনে এসে বৈঠকে বসার প্রস্তাব দেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রতীক। তিনি জানিয়েছেন, বিমান বসুর প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি মুখোমুখি হতে পারবেন না। প্রতীকের অভিযোগ, তাঁর পদত্যাগপত্র থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত স্তরের আলোচনা— সবকিছুই দলের একটি নির্দিষ্ট লবি সংবাদমাধ্যমে ফাঁস করে দিচ্ছে। এই ‘ফাঁস’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তিনি আলোচনায় বসতে নারাজ।

মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে ‘সাম্প্রদায়িক’ হওয়ার গুরুতর অভিযোগ

প্রতীক উর রহমানের নিশানায় যে সরাসরি মহম্মদ সেলিম, তা এখন আর গোপন নেই। প্রতীকের অনুগামীদের দাবি, সেলিম নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দলের তরুণ ও সক্রিয় নেতাদের কোণঠাসা করছেন। এমনকি সেলিমের বিরুদ্ধে ‘সাম্প্রদায়িক দোষে দুষ্ট’ হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে দলের অন্দরে। প্রতীকের মতে, দলে এখন ‘সেলিব্রিটি কালচার’ চলছে। যারা মাঠে-ঘাটে কাজ করে বা গরিব পরিবার থেকে উঠে এসেছে, তাদের সরিয়ে দিয়ে যারা ফেসবুক বা ইউটিউবে বেশি সক্রিয়, তাদেরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মহম্মদ সেলিমকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “যাঁরা আমাকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করেছেন, তাঁদের রাতের ঘুম আমি হারাম করে দেব। আমি পালিয়ে যাওয়ার ছেলে নই।”

তৃণমূলের পথে প্রতীক? জল্পনা তুঙ্গে

রাজনৈতিক মহলে জোর খবর, কলকাতার এক প্রভাবশালী তৃণমূল সাংসদের সঙ্গে ইতিমধ্যে কয়েক দফা বৈঠক সেরে ফেলেছেন প্রতীক। তৃণমূলও চাইছে এই তরুণ ও লড়াকু সংখ্যালঘু নেতাকে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেদের সেনাপতি হিসেবে ব্যবহার করতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে তাঁর যোগদান এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। বুধবার এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে প্রতীক বলেন, “আমি একটা রাস্তায় হাঁটছিলাম, এখন একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে অনেক বাঁক, ওপারে খাদ আছে না ফুল বিছানো রাস্তা তা জানি না। তবে বাঁকটা আমি পার হবই।”

সৃজন-দীপ্সিতাকে নিয়েও বাড়ছে অস্বস্তি

প্রতীক উর রহমানের এই বিদ্রোহের আঁচ আছড়ে পড়ছে দলের অন্যান্য তরুণ মুখদের ওপরও। এসএফআই-এর সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য এবং নেত্রী দীপ্সিতা ধরকে নিয়েও গুঞ্জন শুরু হয়েছে আলিমুদ্দিনে। জানা গেছে, বুধবার পর্যন্ত দীপ্সিতা ধর তাঁর দলীয় সদস্যপদ নবীকরণ করেননি। প্রতীকের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ এবং তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সমীকরণ দেখেই এই দুই তরুণ নেতা-নেত্রী নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেন। যদি সত্যিই প্রতীক, সৃজন বা দীপ্সিতার মতো মুখেরা দল ত্যাগ করেন, তবে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে সিপিএমের জন্য তা হবে এক অপূরণীয় ক্ষতি।

রাজ্য কমিটির বৈঠকে প্রতীকের অনুপস্থিতি

আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে সিপিএমের দু’দিনের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য কমিটির বৈঠক। কিন্তু সেখানে প্রতীক উর রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সদস্যপদ নবীকরণের আগে দল ছাড়তে চাইলে বহিষ্কারের সংস্থান থাকলেও, এখনই সেই চরম পথে হাঁটতে চাইছে না আলিমুদ্দিন। কারণ, তাতে দলের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ এই নিয়ে কটাক্ষ করে বলেছেন, “সিপিএমের ভেতরে একটা ফেরেব্বাজ লবি তৈরি হয়েছে, ওরাই এখন রাজত্ব করছে।” সব মিলিয়ে প্রতীকের এই ‘বিদ্রোহ’ বঙ্গ সিপিএমকে কোন খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করায়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *