মৃতদেহের হদিস নেই অথচ হাতে এল ১০ লাখের চেক! আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে স্বজনহারাদের হাহাকার

মৃতদেহের হদিস নেই অথচ হাতে এল ১০ লাখের চেক! আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে স্বজনহারাদের হাহাকার

আনন্দপুর: গত ২৫শে জানুয়ারি দক্ষিণ কলকাতার আনন্দপুরের নাজিরাবাদে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, তার স্মৃতি এখনও দগদগে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাংশগুলো এতটাই বিকৃত যে চেনার উপায় নেই তারা ঠিক কার। আজ ২৪ দিন পার হয়ে গেলেও নিখোঁজ ২৭ জনের পরিবার এখনও প্রিয়জনের এক টুকরো দেহাংশটুকুও হাতে পায়নি। অথচ অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি ধরা পড়ল দুর্ভাগা এই পরিবারগুলোর দুয়ারে। স্বজনদের মৃত্যুর কোনও সরকারি শংসাপত্র বা ডিএনএ রিপোর্ট আসার আগেই তাঁদের হাতে পৌঁছে গিয়েছে ১০ লক্ষ টাকার সরকারি ও বেসরকারি ক্ষতিপূরণের চেক।

টাকা এল কিন্তু শান্তি কোথায়?

মেদিনীপুরের নিরঞ্জন মণ্ডল এই অগ্নিকাণ্ডে নিজের ভাই গোবিন্দ এবং ১৮ বছরের ছেলে রামকৃষ্ণকে হারিয়েছেন। দুই প্রিয়জনের শোকে পাথর এই মানুষটির হাতে এখন ১০ লক্ষ টাকার চেক, কিন্তু চোখে জল। তিনি প্রশ্ন তুলছেন, “টাকা তো পেলাম, কিন্তু আগে তো দেহ পাই! দেহ দেওয়ার আগে কেন টাকা দেওয়া হল বুঝলাম না।” পারলৌকিক কাজ করবেন কীভাবে, তা নিয়ে ধন্দে পড়ে শেষমেশ পুরোহিতের পরামর্শে আগামী ১৪ই মার্চ শ্রাদ্ধের দিন ঠিক করেছেন তাঁরা। চেকে হাত দেওয়ার মানসিক অবস্থা নেই এই পরিবারটির।

উনুন জ্বলছে না ঝাড়গ্রামের বাড়িতে

একই করুণ দশা ঝাড়গ্রামের রবীশ হাঁসদার পরিবারে। রবীশ ছিলেন ‘ওয়াও মোমো’র গুদামের নিরাপত্তারক্ষী। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাঁর কোনও চিহ্ন মেলেনি। তাঁর দাদা হাহাকার করে জানালেন, “এখনও অশৌচ পালন করছি। ঘরে আগুন জ্বালতে পারছি না, আত্মীয়দের বাড়ি থেকে খাবার আসছে। পুলিশ বলছে ডিএনএ রিপোর্ট না এলে দেহ দেবে না। অথচ চেক দিয়ে গেল!”

রহস্য ও ধোঁয়াশা

আনন্দপুরের সেই গুদামে সেদিন ঠিক কতজন ছিলেন, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। পুলিশের খাতায় ২৭ জন নিখোঁজ হলেও সেই সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পুলিশ বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালের মাধ্যমে সংগৃহীত দেহাংশগুলো ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠিয়েছে। কিন্তু সেই রিপোর্ট আসতে দীর্ঘ সময় লাগার কথা।

তদন্ত ও গ্রেপ্তার

ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় পুলিশ গুদাম মালিক গঙ্গাধর দাস সহ ‘ওয়াও মোমো’র ম্যানেজার মনোরঞ্জন শিট এবং ডেপুটি ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁরা বর্তমানে জেল হেফাজতে রয়েছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, ডিএনএ রিপোর্টের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি কেন ক্ষতিপূরণ বিলি করা হল? জেলাশাসক বা স্থানীয় নেতাদের দেওয়া এই চেক কি শোকাতুর পরিবারগুলোর ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা, নাকি স্রেফ নিয়মরক্ষা?

অপেক্ষার প্রহর

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ভস্মীভূত দেহাংশ থেকে ডিএনএ আলাদা করা অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পুলিশ সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে মৃত ঘোষণা করতে পারছে না। ফলে মেদিনীপুর থেকে ঝাড়গ্রাম— সর্বত্রই স্বজনহারাদের চোখে এখন কেবল দীর্ঘ প্রতীক্ষা। তাঁদের কাছে এখন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকার চেয়েও অনেক বেশি দামি প্রিয়জনের সেই শেষ স্মৃতিটুকু, যা আঁকড়ে ধরে তাঁরা অন্তত শেষ বিদায়টুকু জানাতে পারেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *