রামকৃষ্ণকে ‘স্বামী’ সম্বোধন মোদীর, বাংলার সংস্কৃতি না কি অজ্ঞতা? রণংদেহি মেজাজে বিঁধলেন মমতা

রামকৃষ্ণকে ‘স্বামী’ সম্বোধন মোদীর, বাংলার সংস্কৃতি না কি অজ্ঞতা? রণংদেহি মেজাজে বিঁধলেন মমতা

ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ১৯১তম জন্মতিথিতে প্রধানমন্ত্রীর একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে শ্রী রামকৃষ্ণকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ‘স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংস’ বলে উল্লেখ করেন। আর এই ‘স্বামী’ শব্দটি ব্যবহার করা নিয়েই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বাংলার আবেগ ও সংস্কৃতিতে আঘাত হানার অভিযোগে মোদীর বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধংদেহি মেজাজে অবতীর্ণ হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত পোস্ট এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য

প্রধানমন্ত্রী মোদী হিন্দিতে করা তাঁর পোস্টে লিখেছিলেন, “স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংস জী-র জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি আদারপূর্ণ শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি যেভাবে আধ্যাত্মিকতা ও সাধনাকে জীবনীশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা প্রতিটি যুগে মানবতার কল্যাণ করতে থাকবে। তাঁর সুচিন্তা ও বার্তা সর্বদা অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।” এই বার্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরের আধ্যাত্মিক প্রভাবের ভূয়সী প্রশংসা করলেও গোল বাঁধে নামের আগে বসা উপসর্গটি নিয়ে।

মমতার তীব্র আক্রমণ ও সাংস্কৃতিক পাঠ

প্রধানমন্ত্রীর এই পোস্টটি রি-শেয়ার করে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর এই সম্বোধনকে ‘সাংস্কৃতিক অসংবেদনশীলতা’ এবং ‘অজ্ঞতা’ বলে চিহ্নিত করেছেন। মমতা স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, “আবারও হতবাক! প্রধানমন্ত্রী আবারও বাংলার মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি তাঁর সাংস্কৃতিক অসংবেদনশীলতা প্রদর্শন করেছেন। আজ যুগাবতার শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মতিথি। মহান সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী অপ্রচলিত ও অনুপযুক্ত ‘স্বামী’ উপসর্গ ব্যবহার করেছেন।”

মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পোস্টে রামকৃষ্ণ মিশনের ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে ব্যাখ্যা করেন যে, শ্রী রামকৃষ্ণকে আপামর বাঙালি সর্বদা ‘ঠাকুর’ হিসেবেই ভক্তিভরে স্মরণ করে। তাঁর শিষ্যরা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠার পর তাঁদের নামের আগে ‘স্বামী’ উপাধি যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজে কোনোদিন ‘স্বামী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। মমতার কথায়, “ঠাকুর হলেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, মা হলেন সারদা দেবী এবং স্বামীজি হলেন স্বামী বিবেকানন্দ।” প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর বিনীত অনুরোধ, বাংলার এই প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের নামের সঙ্গে যেন নতুন কোনো ভুল বিশেষণ যোগ না করা হয়।

বঙ্কিম-বিসংবাদ ও কুণাল ঘোষের কটাক্ষ

তৃণমূল শিবিরের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিম দা’ বলে সম্বোধন করে হাসির খোরাক হয়েছিলেন। এবার রামকৃষ্ণের ক্ষেত্রেও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষও বিষয়টি নিয়ে সুর চড়িয়েছেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “‘স্বামী রামকৃষ্ণ’ নয়, তিনি ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। অনুগ্রহ করে পোস্টটি সংশোধন করুন।”

আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে আঘাত বনাম রাজনৈতিক সংঘাত

নির্বাচনী আবহে যখন বাংলার সংস্কৃতি ও ভূমিপুত্রদের আবেগ নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে দড়ি টানাটানি চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর এই ‘ভুল’ সম্বোধনকে হাতিয়ার করতে বিন্দুমাত্র কসুর করছে না ঘাসফুল শিবির। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অনুগামীদের মধ্যেও এই সম্বোধন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে যে কাউকে স্বামী বলা গেলেও, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ক্ষেত্রে ‘ঠাকুর’ শব্দটি এক অনন্য আবেগের নাম, যা বিকৃত করা কাম্য নয়।

বাংলার কৃষ্টি ও মনীষীদের নিয়ে বিজেপির এই ‘অজ্ঞতা’ আগামীর রাজনৈতিক লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কতখানি কার্যকরী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *