বিড়ি শ্রমিকদের জন্য পৌষ মাস! চালু হলো আধুনিক ১০০ শয্যার বিশেষ হাসপাতাল

নিজস্ব প্রতিনিধি, মুর্শিদাবাদ
মুর্শিদাবাদ জেলার অর্থনৈতির মেরুদণ্ড বিড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সামশেরগঞ্জের অনুপনগর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বরে যাত্রা শুরু করল ১০০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক বিড়ি শ্রমিক হাসপাতাল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই হাসপাতালটি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীনে শুধুমাত্র বিড়ি শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য তৈরি প্রথম বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র।
কেন এই হাসপাতাল বিড়ি শ্রমিকদের জন্য ‘লাইফলাইন’
মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১২ থেকে ১৩ লক্ষ মানুষ বিড়ি শিল্পের সঙ্গে জড়িত, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ১০ লক্ষ শ্রমিকের বাস কেবল জঙ্গিপুর মহকুমা এলাকায়। দিনের পর দিন তামাক পাতা, ধুলো ও বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করার ফলে এই শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষ্মা (TB), ফুসফুসের ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট এবং নানা ধরনের চর্মরোগ মহামারীর আকার নেয়। এতদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের বহরমপুর বা কলকাতার হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হতো। এবার ঘরের নাগালেই মিলবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ।
হাসপাতালে মিলবে যেসব আধুনিক সুবিধা
জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডা. সন্দীপ সান্যাল জানিয়েছেন, হাসপাতালটিতে বর্তমানে ১০০টি শয্যা চালু হলেও এর পরিকাঠামো ১৫০ শয্যা পর্যন্ত বিস্তৃত করার ক্ষমতা রাখে। বিড়ি শ্রমিকদের পরিষেবায় কোনও খামতি না রাখতে ইতিমধ্যেই নিয়োগ করা হয়েছে ১৪ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। হাসপাতালের প্রধান আকর্ষণগুলি হলো:
- বিশেষজ্ঞ বিভাগ: এখানে হাড়ের চিকিৎসার জন্য ২ জন অর্থোপেডিক, নাক-কান-গলার জন্য ২ জন ইএনটি, ২ জন চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং ফুসফুসের সমস্যার জন্য ২ জন বক্ষরোগ (Chest) বিশেষজ্ঞ সার্বক্ষণিক পরিষেবা দেবেন।
- অত্যাধুনিক সরঞ্জাম: প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বসানো হয়েছে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন। এ ছাড়াও থাকছে ২৯টি আইসিইউ (ICU) শয্যা এবং সম্পূর্ণ প্যাথলজি ল্যাবরেটরি, যেখানে রক্ত পরীক্ষাসহ সব ধরনের প্যাথলজিক্যাল সুবিধা মিলবে।
- মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাব: হাসপাতালের ঠিক উল্টো দিকেই গড়ে উঠেছে ৩০০ শয্যার ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাব’। ফলে শ্রমিক পরিবারের গর্ভবতী মহিলারাও একই চত্বরে উন্নত প্রসূতি পরিষেবা পাবেন।
স্বস্তিতে গঙ্গা ভাঙন কবলিত সামশেরগঞ্জ
গঙ্গা ভাঙন এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা সামশেরগঞ্জের বাসিন্দাদের জন্য এই হাসপাতাল এক বড় প্রাপ্তি। এতদিন জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতাল কিংবা মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে ছুটতে হতো। এখন ঘরের কাছেই আধুনিক আইসিইউ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়ায় সময় ও অর্থ দুই-ই বাঁচবে। প্রশাসনের দাবি, ভবিষ্যতে রোগীর চাপ বাড়লে শয্যা সংখ্যা ও চিকিৎসকের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। বিড়ি শ্রমিকদের কল্যাণে সরকারের এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ জেলার স্বাস্থ্য মানচিত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল।