বাবার পরিচয়ে আর কলঙ্ক নয়, ধর্ষণের শিকার মায়ের পদবীই হবে সন্তানের পরিচয়! ঐতিহাসিক রায় বম্বে হাইকোর্টের

ধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধের শিকার হওয়ার পর এক লড়াকু মা এবং তাঁর ১২ বছরের কিশোরী কন্যার দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে এল ঐতিহাসিক জয়। ভারতের বিচারব্যবস্থায় এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে বম্বে হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দিল, কোনো সন্তানকে তার অপরাধী বাবার কলঙ্কিত পদবী বয়ে বেড়াতে হবে না। বরং যে মা এক হাতে সন্তানকে আগলে বড় করছেন, সেই মায়ের পরিচয়েই পরিচিত হবে তাঁর সন্তান।
আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং যুগান্তকারী রায়
বিচারপতি বিভা কঙ্কনওয়ারি এবং বিচারপতি হিতেন এস ভেনেগাওকারের ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলায় মানবিকতা ও সাংবিধানিক অধিকারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। ১২ বছরের ওই কিশোরীর স্কুলের নথিতে বাবার নাম মুছে দিয়ে মায়ের নাম, পদবী এবং ধর্ম ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে আদালত। বিচারপতিদের মতে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং সংবিধানসম্মত মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করাই আদালতের লক্ষ্য।
আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, একটি শিশুর জন্মের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, কোনো অপরাধীর পরিচয় তার ওপর বোঝা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। একা মা যখন সন্তানকে বড় করেন, তখন তাঁর পরিচয় ব্যবহার করলে সমাজ দুর্বল হয় না, বরং আরও উন্নত ও সভ্য হয়।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক বছর আগে। ধর্ষণের শিকার হয়ে এক তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পরে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অভিযুক্তের পিতৃত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর স্কুলের নথিতে সেই ব্যক্তির নাম যুক্ত করা হয়েছিল। ২০২২ সালে আদালত ওই নাবালিকার সমস্ত দায়িত্ব মায়ের হাতে তুলে দিলেও বাবার নাম পরিবর্তনের আবেদন ঝুলে ছিল।
২০২৫ সালে স্কুল শিক্ষা দফতর ওই আবেদন খারিজ করে দিয়ে দাবি করেছিল যে, প্রচলিত ‘স্কুল কোড’ অনুযায়ী বাবার নাম পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন নির্যাতিতা মা।
কেন এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
নাবালিকার আইনজীবীরা সওয়াল করেছিলেন যে, যে বাবা কোনোদিন সন্তানের দায়িত্ব পালন করেননি এবং যিনি একজন প্রমাণিত অপরাধী, তাঁর নাম নথিতে থাকলে শিশুটিকে প্রতিনিয়ত সামাজিক লাঞ্ছনা ও মানসিক চাপের শিকার হতে হবে। আদালত এই যুক্তি গ্রহণ করে জানায়:
- সামাজিক মর্যাদা: বাবার নাম বা পদবী বহন করা কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়, বিশেষ করে যখন সেই বাবা একজন অপরাধী।
- মায়ের একক অধিকার: যদি মা একক অভিভাবক হিসেবে সন্তানকে বড় করেন, তবে আইনি ও নৈতিকভাবে সন্তানের ওপর কেবল মায়ের পরিচয়েরই অধিকার থাকা উচিত।
- অপমান থেকে মুক্তি: অপরাধী বাবার পরিচয় থেকে মুক্তি দিয়ে শিশুকে এক সুস্থ ও সম্মানজনক জীবন দেওয়ার পথ প্রশস্ত করল এই রায়।
বম্বে হাইকোর্টের এই নির্দেশিকা কেবল একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং দেশের হাজার হাজার একক মা এবং নির্যাতনের শিকার নারীদের কাছে এক নতুন আশার আলো। এই রায় স্পষ্ট করে দিল যে, পিতৃপরিচয় নয়, বরং একজন মায়ের লড়াই আর ভালোবাসাই হোক সন্তানের আসল পরিচয়।