ছেলেধরা গুজবে মা ও মেয়েকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা, ৯ বছর পর ২৫ গ্রামবাসীর কপালে চিন্তার ভাঁজ

হুগলি: ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি এবং মা ও মেয়েকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টার সেই শিউরে ওঠা স্মৃতি আজও টাটকা হুগলির বলাগড়ে। অবশেষে দীর্ঘ ৯ বছর পর সেই নারকীয় ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দিল চুঁচুড়া আদালত। আসানপুর গ্রামের সেই উন্মত্ত জনতার ২৫ জন সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করলেন বিচারক। ২০১৭ সালের সেই রক্তক্ষয়ী বিকেলে পুলিশকে লক্ষ্য করে তির ছোড়া থেকে শুরু করে গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে আদালতের কাঠগড়ায়।
অধ্যাপক-পত্নীকে খুনের চেষ্টা ও পুলিশের ওপর হামলা
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের স্ত্রী রঞ্জুবালা ঘোষ তাঁর মেয়ে অপর্ণাকে সঙ্গে নিয়ে পরিচারিকার খোঁজে গিয়েছিলেন বলাগড়ের আসানপুর গ্রামে। সঙ্গে ছিলেন গাড়ির চালক বিশ্বনাথ মণ্ডল। গ্রামে অপরিচিত লোক দেখেই হঠাৎ রটে যায় ‘ছেলেধরা’ গুজব। মুহূর্তের মধ্যে গ্রামবাসীরা ঘিরে ফেলে তাঁদের গাড়ি। শুরু হয় বেধড়ক মারধর। উন্মত্ত জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে মা ও মেয়েকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে।
খবর পেয়ে বলাগড় থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গ্রামবাসীদের আক্রমণের মুখে পড়েন পুলিশকর্মীরাও। ১১ জন পুলিশকর্মী ও সিভিক ভলান্টিয়ার গুরুতর আহত হন। এমনকি অখিলবন্ধু ঘোষ নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ার সরাসরি তিরবিদ্ধ হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয়েছিল প্রশাসনকে।
আদালতের যুগান্তকারী রায়
তদন্তকারী অফিসার অলককুমার চট্টোপাধ্যায় ঘটনার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ২৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেন। দীর্ঘ শুনানি এবং ২৭ জন সাক্ষীর বয়ান গ্রহণের পর চুঁচুড়া আদালতের ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্টের বিচারক পীযূষকান্তি রায় অভিযুক্ত ২৫ জনকেই দোষী সাব্যস্ত করেছেন। দোষীদের মধ্যে ৫ জন মহিলাও রয়েছেন।
সরকারি আইনজীবী শঙ্কর গাঙ্গুলি এই রায়কে ‘যুগান্তকারী’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, সেই সময় রাজ্যজুড়ে ছেলেধরা গুজবের যে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, এটি তার বিরুদ্ধে একটি কড়া বার্তা। আগামীকাল অর্থাৎ শুক্রবার এই মামলায় সাজা ঘোষণা করা হবে। যে সমস্ত ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তাতে দোষীদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। সাম্প্রতিক অতীতে একসঙ্গে এতজন অভিযুক্তের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা বিরল।