মেঘের রাজ্যে লুকানো হিরের খনি, উত্তর সিকিমের এই গ্রাম একবার না দেখলে জীবন বৃথা

হিমালয়ের কোলে এক টুকরো রূপকথা যেন সশরীরে নেমে এসেছে ভারতের মানচিত্রে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮,৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত উত্তর সিকিমের লাচেন গ্রামটি এখন বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে এক পরম বিস্ময়। তিব্বতি ভাষায় ‘লাচেন’ শব্দের অর্থ ‘বড় গিরিপথ’, আর এই নামকরণের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় এখানকার বিশালকার পর্বতশৃঙ্গ এবং সুগভীর উপত্যকার মাঝে দাঁড়ালে। তিস্তা নদীর শাখা লাচেন চু-এর কলতান আর পাইন-ফার গাছের নিস্তব্ধতা মিলে এখানে তৈরি করে এক মায়াবী পরিবেশ, যা যান্ত্রিক শহরের ক্লান্তি নিমেষেই ধুয়ে মুছে দেয়।
নিসর্গের ক্যানভাসে লাচেনের রূপ
লাচেনের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর ঋতু পরিবর্তনের বৈচিত্র্যে। শীতকালে যখন ঘন তুষারপাতে পুরো গ্রাম সাদা চাদরে ঢাকা পড়ে, তখন মনে হয় যেন কোনো বিদেশি ড্রইংরুমের ওয়ালপেপার দেখছেন। আবার বসন্ত আসতেই রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে রঙের ছোঁয়া লাগে। চারিদিকে ফুটে ওঠে রডোডেনড্রন এবং নাম না জানা অজস্র আল্পাইন ফুল। পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা মেঘেদের লুকোচুরি খেলা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে যে, আপনি এখন সাধারণ কোনো জনপদে নেই, বরং মেঘেদের আসল ঠিকানায় পৌঁছে গিয়েছেন।
রোমাঞ্চ আর আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন
লাচেনকে কেন্দ্র করে পর্যটকরা এমন কিছু জায়গার সন্ধান পান যা সারাজীবন মনে রাখার মতো। এখানকার প্রধান আকর্ষণগুলো হলো:
- গুরুদংমার লেক: ১৭,৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদটি বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম এবং পবিত্র জলাশয়। নীল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জলরাশি আর চারিদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়ের শৃঙ্গ এক স্বর্গীয় দৃশ্যের অবতারণা করে। বৌদ্ধ ও শিখ উভয় ধর্মের মানুষের কাছে এই লেকটি অত্যন্ত পবিত্র।
- লাচেন মনাস্ট্রি: গ্রামের উঁচু অংশে অবস্থিত এই প্রাচীন গুম্ফাটি তিব্বতি স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। এখান থেকে পুরো লাচেন উপত্যকার প্যানোরামিক ভিউ পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
- চোপতা ভ্যালি: যারা ট্রেকিং এবং অফবিট লোকেশন পছন্দ করেন, তাদের জন্য চোপতা ভ্যালি এক স্বর্গরাজ্য। বিশেষ করে মে-জুন মাসে এখানে ফুলের সমারোহ দেখার মতো হয়।
- থাঙ্গু ভিলেজ: উচ্চতায় খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য (Acclimatization) পর্যটকরা এখানে বিরতি নেন। এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটির সরলতা যে কাউকে শান্ত করে দেয়।
স্থানীয় জীবন ও ‘লাচেনপা’ সংস্কৃতি
লাচেনের স্থানীয় বাসিন্দারা ‘লাচেনপা’ নামে পরিচিত। এখানকার সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, যা পরিচালিত হয় প্রাচীন ‘ঝুমসা’ বা গ্রাম পরিষদের মাধ্যমে। কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ি, বারান্দায় উড়তে থাকা রঙিন প্রেয়ার ফ্ল্যাগ এবং স্থানীয় পাহাড়ি খাবারের সুবাস এখানকার পরিবেশে এক আধ্যাত্মিক শান্তি বজায় রাখে। বর্তমানে পর্যটকদের জন্য এখানে প্রচুর হোমস্টে গড়ে উঠেছে, যেখানে স্থানীয়দের আতিথেয়তা এবং ঘরোয়া খাবার আপনার ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলবে।
ভ্রমণের পরিকল্পনা ও জরুরি টিপস
লাচেন ভ্রমণের সেরা সময় হলো মার্চ থেকে জুন এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস। তবে উত্তর সিকিম একটি সংরক্ষিত এলাকা হওয়ায় পর্যটকদের গ্যাংটক থেকে আগেভাগেই বিশেষ পারমিট সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া মনে রাখবেন, লাচেন একটি সম্পূর্ণ ‘প্লাস্টিক-মুক্ত’ এলাকা, তাই পরিবেশ রক্ষায় এখানে প্লাস্টিকের বোতল বা ব্যাগ ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। উচ্চতা বেশি হওয়ায় পর্যটকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত গরম কাপড় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখা জরুরি।