৭০ হাজার কোটির বিল গায়েব! হায়দরাবাদের রেস্তরাঁ চেইনের দুর্ধর্ষ জালিয়াতি ফাঁস করল আয়কর দফতর

হায়দরাবাদ: সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভুরিভোজ করাচ্ছে নামী রেস্তরাঁ চেইন, অথচ সরকারের ঘরে ট্যাক্স দেওয়ার বেলায় লবডঙ্কা। হায়দরাবাদের কয়েকটি রেস্তরাঁয় আয়কর দফতরের (Income Tax Department) একটি রুটিন তল্লাশি থেকেই বেরিয়ে এল দেশজুড়ে চলা এক মহাজালিয়াতির কঙ্কালসার চেহারা। তদন্তে জানা গেছে, একটি বিশেষ বিলিং সফটওয়্যারের কারসাজিতে গত কয়েক বছরে প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকারও বেশি বিক্রি গোপন করা হয়েছে।
এআই প্রযুক্তিতে ধরা পড়ল ডিজিটাল কারচুপি
আয়কর আইনের ১৩৩এ ধারায় তদন্ত শুরু করে অফিসাররা প্রায় ৬০ টেরাবাইট ডিজিটাল তথ্য বা ডেটা বিশ্লেষণ করেছেন। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত ছয় বছরের যাবতীয় বিলিং রেকর্ড খতিয়ে দেখে চক্ষু চড়কগাছ দুঁদে গোয়েন্দাদেরও। জেনারেটিভ এআই (GenAI) ব্যবহার করে প্রায় ১.৭৭ লক্ষ রেস্তরাঁ আইডি-র তথ্য পরীক্ষা করা হয়। দেখা গেছে, দেশের মোট রেস্তরাঁ বাজারের প্রায় ১০ শতাংশ এই নির্দিষ্ট জালিয়াতিপূর্ণ সফটওয়্যারটি ব্যবহার করত।
তদন্তকারী আধিকারিকদের মতে, মোট ২.৪৩ লক্ষ কোটি টাকার বিলিংয়ের মধ্যে অন্তত ১৩,৩১৭ কোটি টাকার তথ্য সিস্টেম থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে (Post-billing deletion)। এটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ছক।
জালিয়াতির তিন ‘মাস্টারপ্ল্যান’
তদন্তে রেস্তরাঁ মালিকদের কর ফাঁকি দেওয়ার তিনটি প্রধান কৌশলের হদিস মিলেছে:
- ক্যাশ ইনভয়েস মুছে ফেলা: ডিজিটাল লেনদেন বা ইউপিআই পেমেন্টের রেকর্ড সিস্টেমে থাকলেও, নগদ টাকায় হওয়া বিক্রির বিলগুলো বেছে বেছে সার্ভার থেকে ডিলিট করে দেওয়া হত।
- বাল্ক ডিলিশন: কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক টানা কয়েক দিন বা এক মাসের সমস্ত বিক্রির রেকর্ড এক ক্লিকেই গায়েব করে দেওয়া হত।
- রিটার্নে তথ্য গোপন: সফটওয়্যারের ব্যাকএন্ডে বিক্রির পরিমাণ বেশি থাকলেও, আয়কর জমা দেওয়ার সময় সেই অংক কমিয়ে দেখানো হত।
কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় লুটপাটের পাহাড়
রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুর্নীতির নিরিখে শীর্ষে রয়েছে কর্ণাটক। সেখানে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার বিল মুছে ফেলা হয়েছে। তালিকায় এরপরই রয়েছে তেলেঙ্গানা (১,৫০০ কোটি) এবং তামিলনাডু (১,২০০ কোটি)। শুধুমাত্র অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার ৩,৭৩৪টি প্যান কার্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে ৫,১৪১ কোটি টাকার বিক্রি গোপন করা হয়েছে। কোনো কোনো রেস্তরাঁ তাদের মোট ব্যবসার প্রায় ২৭ শতাংশ আয় সরকারের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে।
কড়া ব্যবস্থার পথে সিবিডিটি
আহমেদাবাদের একটি সফটওয়্যার সংস্থার অফিস থেকেই এই জালিয়াতির মূল নিয়ন্ত্রণ চলত বলে মনে করা হচ্ছে। হায়দরাবাদ এবং বিশাখাপত্তনম থেকে শুরু হওয়া এই তদন্তের জাল এবার সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডাইরেক্ট ট্যাক্সেস (CBDT)। আয়কর দফতর সাফ জানিয়েছে, যে সমস্ত রেস্তরাঁ মালিক বা সংস্থা এই ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে কর ফাঁকি দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে দেশের অন্যান্য বিলিং সফটওয়্যারগুলোকেও এবার কড়া নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে।