হুমকি দিয়ে বিপাকে রাজু বিস্তা, বিজেপি সাংসদের বিরুদ্ধে কমিশনে নালিশ বিষ্ণুপ্রসাদের

দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতিতে পারদ চড়ছে। একদিকে দলবদল, অন্যদিকে খোদ বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার বিরুদ্ধে ‘গুন্ডাগিরি’র অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন তাঁরই প্রাক্তন সতীর্থ তথা কার্শিয়াং-এর বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা। প্রজাতন্ত্র দিবসের এক অনুষ্ঠানে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে এবার নির্বাচন কমিশন ও জেলা পুলিশ সুপারের দ্বারস্থ হলেন তিনি। যা নিয়ে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
কী বলেছিলেন রাজু বিস্তা?
গত ২৬ জানুয়ারি কার্শিয়াং-এর মন্টিভিট গ্রাউন্ডে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন দার্জিলিং-এর বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি রীতিমতো হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, “২০২৬ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গড়বে। আর তখন এই পুলিশের লাঠি আমার হাতেই আসবে। ভাবুন তো, সেই লাঠি যখন আমার হাতে থাকবে, তখন কে কে মার খাবে? সেই তালিকা অনেক লম্বা, পরে আপনাদের পড়ে শোনাব।” এই মন্তব্যের ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় বিতর্ক। একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এহেন ‘কুরুচিকর’ ও ‘উস্কানিমূলক’ মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে কমিশনে চিঠি দিয়েছেন বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা।
পাল্টা আক্রমণে তৃণমূল: ‘সবচেয়ে বড় গুন্ডা’ বিতর্ক
রাজু বিস্তাকে বিঁধতে ছাড়েনি তৃণমূল কংগ্রেসও। সম্প্রতি ফাঁসিদেওয়ায় একটি জমি বিবাদকে কেন্দ্র করে পুলিশকে ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে সাংসদের বিরুদ্ধে। সেখানে নিজেকে ‘সবচেয়ে বড় গুন্ডা’ বলে দাবি করেছিলেন তিনি। সেই প্রসঙ্গ টেনে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের সভাধিপতি তথা তৃণমূল নেতা অরুণ ঘোষ বলেন, “তৃণমূলের গুন্ডারা বিজেপিতে যাক, কারণ ওখানে রাজু বিস্তার মতো বড় গুন্ডা বসে আছে।” তাঁর দাবি, বিজেপি আসলে গুন্ডাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এবং রাজু বিস্তার আচরণ তারই প্রমাণ।
বিষ্ণুপ্রসাদের পদ্মত্যাগ ও ঘাসফুলে যোগদান
পাহাড়ের রাজনীতিতে সবথেকে বড় চমকটি এসেছে বৃহস্পতিবার। দীর্ঘদিনের মান-অভিমানের পালা শেষ করে কলকাতায় তৃণমূল ভবনে গিয়ে ঘাসফুল শিবিরে যোগ দিয়েছেন কার্শিয়াং-এর বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা। মন্ত্রী শশী পাঁজা ও ব্রাত্য বসুর উপস্থিতিতে তিনি তৃণমূলের পতাকা হাতে তুলে নেন।
বিষ্ণুপ্রসাদের দলবদলের নেপথ্যে একাধিক কারণ উঠে আসছে:
- পৃথক রাজ্যের দাবি: ২০২১ সালে উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জিতলেও কেন্দ্র সেই দাবি পূরণ করেনি বলে তাঁর অভিযোগ।
- ভূমিপুত্র বিতর্ক: ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে দার্জিলিং কেন্দ্রে ভূমিপুত্র প্রার্থীর দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। বিজেপি তা না মানায় তিনি নির্দল হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও জয়ী হতে পারেননি।
- নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব: রাজু বিস্তার সঙ্গে তাঁর সংঘাত দীর্ঘদিনের, যা এবার চূড়ান্ত রূপ নিল।
২০২৬-এর আগে পাহাড়ের সমীকরণ
বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মার এই দলবদল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পাহাড়ের মাটিতে তৃণমূলের জমি শক্ত করতেই বিষ্ণুপ্রসাদকে হাতিয়ার করা হচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তবে পাহাড়ের ভোটাররা এই দলবদলকে কতটা ইতিবাচকভাবে নেবেন, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এর ফলে পাহাড়ে বিজেপির সংগঠনে বড়সড় ফাটল ধরবে, আবার অনেকের মতে পাহাড়ের আবেগ সবসময়ই অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে, রাজু বিস্তার ‘লাঠি’ বিতর্ক আর বিষ্ণুপ্রসাদের ‘তৃণমূল’ যাত্রা— এই দুই ঘটনায় এখন তপ্ত কাঞ্চনজঙ্ঘার পাদদেশ।