বিদেশি লিপি নয় দেবনাগরীতেই মুক্তি! ত্রিপুরার ককবরক নিয়ে অমিত শাহের হুঙ্কারে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

আগরতলা: ত্রিপুরার পাহাড়ে দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে চলা ককবরক ভাষার লিপি বিতর্ক এবার নয়া মোড় নিল। এতদিন রোমান লিপির দাবিতে আন্দোলন চললেও, আগরতলায় দাঁড়িয়ে সরাসরি ‘দেবনাগরী’ লিপির পক্ষে সওয়াল করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, বিদেশি লিপির মোহ ত্যাগ করে ভারতীয় লিপিতেই সুরক্ষিত থাকবে জনজাতির নিজস্ব সত্তা।
লিপি বির্তকে শাহের ‘মাস্টারস্ট্রোক’
আগরতলায় উত্তর-পূর্ব ভারতের আঞ্চলিক রাজভাষা সম্মেলনে যোগ দিয়ে অমিত শাহ বলেন, “ত্রিপুরায় ভাষা বা লিপি নিয়ে কোনোদিন সংঘাত ছিল না। এখানে বাংলা, ককবরক এবং হিন্দি সহাবস্থান করছে।” তবে লিপিহীন ভাষাগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি দেবনাগরী বা নাগরী লিপির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, রোমান লিপির মতো ‘বিদেশি’ মাধ্যম দিয়ে কোনো জাতির নিজস্ব পরিচয় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তিনি জার্মানি, জাপান ও ফ্রান্সের উদাহরণ টেনে বলেন, নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করেই এই দেশগুলো বিশ্বসেরা হয়েছে।
হিন্দি ও আঞ্চলিক ভাষার মেলবন্ধন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এদিন হিন্দি ভাষাকে অন্যান্য ভারতীয় ভাষার ‘বোন’ বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, হিন্দি শক্তিশালী হলে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাগুলিও সমৃদ্ধ হবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকশ ভাষা ও উপভাষাকে অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে দেবনাগরী লিপিকে একটি সর্বজনীন সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, বর্তমানে দেবনাগরী লিপি কম্পিউটার বান্ধব এবং বৈজ্ঞানিক হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
মুখ্যমন্ত্রীর সমর্থন ও বিরোধীদের বিক্ষোভ
অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহাও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুরেই সুর মেলান। তিনি বলেন, “হিন্দি বিবিধতার মধ্যে ঐক্য নিয়ে আসে। স্থানীয় ভাষার সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রভাষা হিন্দির প্রসার একসাথেই ঘটাতে হবে।”
তবে অমিত শাহের এই সফর ঘিরে রাজনৈতিক পারদ চড়েছে। কংগ্রেস ভবনে কালো পতাকা লাগিয়ে ‘হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার’ চেষ্টার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখায় কংগ্রেস কর্মীরা। অন্যদিকে, সিপিআইএম সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়ে প্রশ্ন তুলেছে গত আট বছরের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বিশেষ করে বছরে ৫০ হাজার চাকরি এবং ১০৩২৩ শিক্ষকদের সমস্যার সমাধান কোথায়, সেই প্রশ্ন তুলেছে বাম শিবির।
নীরব তিপ্রা মথা ও আইপিএফটি
ককবরক লিপির আন্দোলনে এতদিন সামনের সারিতে থাকা তিপ্রা মথা এবং আইপিএফটি-র পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তিপ্রা মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর মাণিক্য দেববর্মা এই মুহূর্তে নীরব থাকলেও, দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তবেই তাঁরা পরবর্তী পদক্ষেপ জানাবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ‘নাগরী লিপি’ দাওয়াই ত্রিপুরার উপজাতি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করে কি না, এখন সেটাই দেখার।