ট্রাম্পের শুল্ক দাপট চুরমার করে দিল এক খেলনা কো ম্পা নি, কোটি কোটি ডলার ফেরতের নির্দেশে বিপাকে হোয়াইট হাউস

নিজস্ব সংবাদাতা, শিকাগো: বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজের হাতের পুতুল ভেবে যারা চালনা করতে চেয়েছিলেন, তাঁদের জোর ধাক্কা দিল আমেরিকারই এক সাধারণ খেলনা প্রস্তুতকারী সংস্থা। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্ক নীতিকে আইনি লড়াইয়ে কার্যত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের একটি ছোট সংস্থা ‘লার্নিং রিসোর্সেস’। আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে মার্কিন আমদানিকারকদের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ফেরত পাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক দম্ভের মূলে কুঠারাঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার মার্কিন আদালতের এক যুগান্তকারী রায়ে জানানো হয়েছে, ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’-এর অপব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসন যে অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়েছিল, তা সম্পূর্ণ বেআইনি ও বাতিলযোগ্য। এই রায়ের ফলে কয়েক হাজার আমদানিকারক সংস্থা এখন সরকারের কাছ থেকে তাঁদের জমা দেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরতের দাবি জানাতে পারবে।
ডেভিড বনাম গোলিয়াথ: যেভাবে শুরু লড়াই
আমদানিনির্ভর ছোট ব্যবসাগুলোর পিঠ যখন দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, তখন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘লার্নিং রিসোর্সেস’। মূলত চিন থেকে শিক্ষামূলক খেলনা আমদানি করা এই সংস্থাটি গত এপ্রিলে প্রথম মামলা ঠুকে দেয়। তাদের দাবি ছিল, জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে চাপানো এই শুল্ক ছোট ব্যবসায়ীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। সংস্থার সিইও রিক ওল্ডেনবার্গ অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, “সরকার জানে তারা আমাদের পকেট থেকে কত টাকা নিয়েছে। এখন সেই গিয়ার ঘুরিয়ে আমাদের টাকা আমাদের হাতেই ফেরত দেওয়ার সময় এসেছে।”
ওল্ডেনবার্গের সাফ কথা, এটি কোনও রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন। তিনি বলেন, “সরকার যদি মনে করে দেশের রাজস্ব বাড়ানো প্রয়োজন, তবে তা নিয়ে কংগ্রেসে প্রকাশ্য বিতর্ক হোক। হুট করে ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে সাপ্লাই চেইন ধ্বংস করা কাম্য নয়।”
ঘরওয়াপসি কি এতই সহজ?
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, চিনের ওপর শুল্ক বাড়ালে মার্কিন সংস্থাগুলো বাধ্য হয়ে উৎপাদন আমেরিকায় ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু বাস্তবের জমিতে দাঁড়িয়ে ওল্ডেনবার্গ দেখিয়েছেন এই যুক্তি কতটা অন্তঃসারশূন্য। তাঁর চিনের কারখানায় ৩০টিরও বেশি বিশালাকার ইনজেকশন-মোল্ডিং মেশিন রয়েছে, যার প্রতিটির ওজন কয়েক টন। এই বিশাল পরিকাঠামো রাতারাতি ক্রেন বা ট্রাক দিয়ে আমেরিকায় সরিয়ে আনা লজিস্টিক্যালি আসাম্ভব এবং আকাশছোঁয়া ব্যয়সাপেক্ষ। তার ওপর চিনা কর্মীদের যে বিশেষ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন।
মামলার পাহাড়ে চাপা পড়ছে প্রশাসন
এই একটি রায়ের প্রভাব যে কতখানি সুদূরপ্রসারী, তা বোঝা যায় পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। গত এপ্রিল থেকে ‘ইউনাইটেড স্টেটস কোর্ট অফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’-এ শুল্ক সংক্রান্ত প্রায় ১,৮০০-র বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। ২০২৪ সালের মোট মামলার সংখ্যার তুলনায় যা কয়েক গুণ বেশি। মার্কিন চেম্বার অফ কমার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার ৯৭ শতাংশ আমদানিকারকই ছোট মাপের ব্যবসায়ী, যারা বছরে প্রায় ৮৬৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। এই বিশাল অংশটি এখন আদালতের রায়ে আশার আলো দেখছে।
শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে জেদি ব্যবসায়ীদেরই। ওল্ডেনবার্গ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছেন, শুল্কের টাকা ফেরত পেলেই তাঁরা আবার সেই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন এবং থমকে যাওয়া চাকা আবার সচল হবে। ট্রাম্পের শুল্ক-তরবারিকে এক ছোট খেলনা কো ম্পা নির এই প্রতিহত করার ঘটনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে এক বড় বার্তা পৌঁছে দিল।