পুরুলিয়ার প্রসন্নর রহস্যমৃত্যু বেঙ্গালুরুতে, খুনের অভিযোগে উত্তাল ঝালদা

পুরুলিয়ার প্রসন্নর রহস্যমৃত্যু বেঙ্গালুরুতে, খুনের অভিযোগে উত্তাল ঝালদা

নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া

ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে ফের প্রাণ হারালেন বাংলার আরও এক পরিযায়ী শ্রমিক। মহারাষ্ট্রের পুনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে রহস্যমৃত্যু হল পুরুলিয়ার প্রসন্ন কুমারের (৩৯)। পরিবারের দাবি, এটি নিছক মৃত্যু নয় বরং সুপরিকল্পিত খুন। এই কঠিন সময়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর উদ্যোগেই দেহ দ্রুত রাজ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ফেরা হল না ঘরে, নিথর দেহ আসছে চেক্যা গ্রামে

পুরুলিয়ার কোটশিলা থানার অন্তর্গত ঝালদা দু’নম্বর ব্লকের চেক্যা গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা প্রসন্ন কুমার। পরিবারের অভাব মেটাতে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বেঙ্গালুরুতে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে সাম্পিগেহাল্লি থানা এলাকার একটি বেসরকারি সংস্থায় ড্রাইভার হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু সেই যাওয়াই যে শেষ যাওয়া হবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি তাঁর পরিবার। প্রসন্নর বাড়িতে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী কুন্তি কুমার এবং দুই পুত্র সন্তান— যাদের একজন এবার মাধ্যমিক দিয়েছে এবং অন্যজন নবম শ্রেণির ছাত্র।

মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

পরিবারের অভিযোগ, গত এক বছর ধরে প্রসন্ন বারবার বাড়ি ফিরতে চাইলেও ঠিকাদার সংস্থা তাঁকে জোর করে আটকে রাখত। অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদার সুষেনকুমার তেওয়ারির বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, প্রসন্ন অন্তত তিন-চারবার লুকিয়ে স্টেশনে চলে এলেও তাঁকে ধরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এমনকি ২০ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও তা ঠিকমতো দেওয়া হতো না বলে অভিযোগ। গত বৃহস্পতিবার রাতেও স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল প্রসন্নর। জানিয়েছিলেন খুব শীঘ্রই বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু শুক্রবার সকালেই সব শেষ। ফোনের ওপার থেকে জানানো হয়, ঘুমন্ত অবস্থাতেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর।

শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও খুনের দাবি

মৃতের শ্যালক গুরুবন্থ কুমার সরাসরি খুনের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানান, প্রসন্নর মাথায়, নাকে এবং ডান হাতের আঙুলে গভীর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘুমন্ত অবস্থায় মৃত্যু হলে এই ক্ষতগুলো কোথা থেকে এল, সেই প্রশ্ন তুলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে পরিবার। এদিকে, শুক্রবার মৃত্যু হলেও শনিবার বিকেল পর্যন্ত ময়নাতদন্ত না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।

পরিবারের রক্ষাকর্তা হয়ে পাশে অভিষেক

ঘটনাটি জানতে পেরেই সক্রিয় হন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি উজ্জ্বল কুমার জানান, স্থানীয় পুলিশ সহযোগিতা না করায় তিনি সরাসরি কলকাতায় অভিষেকের দপ্তরে যোগাযোগ করেন। নেতার হস্তক্ষেপে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। দেহ ফেরানোর ব্যবস্থার পাশাপাশি মৃত শ্রমিকের পরিবারকে সব ধরনের আইনি ও আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ।

রাজনীতির আঙিনায় পরিযায়ী মৃত্যু

কয়েকদিন আগেই মহারাষ্ট্রের পুণেতে পুরুলিয়ার বরাবাজারের শ্রমিক সুখেন মাহাতোর রহস্যমৃত্যু নিয়ে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়েছিল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের একই জেলা থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় সরব হয়েছে জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল সভাপতি রাজীব লোচন সরেন বলেন, “দেখা যাচ্ছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে গিয়েই বাংলার শ্রমিকদের এই করুণ দশা হচ্ছে। আমরা প্রসন্নর পরিবারের পাশে আছি এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।”

বর্তমানে প্রসন্ন কুমারের কফিনবন্দি দেহের অপেক্ষায় দিন গুনছে চেক্যা গ্রাম। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক, অন্যদিকে দোষীদের শাস্তির দাবিতে ফুঁসছে গোটা এলাকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *