পাকিস্তানের জেল থেকে বীরের বেশে ফেরা রিষড়ার পূর্ণম এখন ফের বিএসএফের ইউনিফর্মে

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, চোখের জল আর অনিশ্চয়তার প্রহর অবশেষে শেষ হলো। পাকিস্তানের বন্দিদশা কাটিয়ে ঘরের ছেলে ফিরেছিলেন আগেই, কিন্তু কপালে জুটেছিল চাকরি হারানোর যন্ত্রণা। তবে রিষড়ার বীর সন্তান পূর্ণম কুমার সাউয়ের অদম্য সাহস আর স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কাছে হার মানল সব প্রতিকূলতা। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ (BSF) কর্তৃপক্ষ পূর্ণমকে সসম্মানে তাঁর চাকরিতে পুনর্বহাল করেছে। গত বৃহস্পতিবার এই খুশির খবর জানাজানি হতেই হুগলীর রিষড়ার বাঁকুড় পার্ক এলাকায় অকাল হোলি শুরু হয়ে গিয়েছে।
সীমান্তের ওপারে সেই ভয়ংকর রাত ও ফিরে আসার লড়াই
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ২৪ এপ্রিল। পাঞ্জাবের পাঠানকোট সীমান্তে ডিউটি করার সময় অসাবধানতাবশত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছিলেন পূর্ণম। সেই সময় উপত্যকায় জঙ্গি হামলার জেরে ভারত-পাক সীমান্ত ছিল চরম উত্তপ্ত। পাকিস্তানি রেঞ্জার্সরা তাঁকে আটক করে দীর্ঘ সময় বন্দি করে রাখে। দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর তিনি দেশে ফেরেন। কিন্তু সরকারি নিয়ম ও বিভাগীয় তদন্তের বেড়াজালে পড়ে তাঁর দীর্ঘ ১৭ বছরের কেরিয়ারে বড় ধাক্কা লাগে। তদন্ত চলাকালীন তাঁকে বরখাস্ত করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা ওই সৈনিকের পরিবারের ওপর কার্যত বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়েছিল।
১৭ বছরের নিখুঁত কেরিয়ার আর ৬টি সম্মানই ফেরাল ভাগ্য
পূর্ণম কুমার সাউয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত চললেও বিএসএফ কর্তৃপক্ষ তাঁর অতীত রেকর্ডের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। দেখা যায়, দীর্ঘ ১৭ বছরের চাকরিতে তিনি কখনও কোনও শৃঙ্খলাভঙ্গ করেননি। উল্টো তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৬টি বিশেষ পুরস্কার। জালন্ধরের বিএসএফ সদর দপ্তর থেকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পূর্ণমকে পুনর্বহালের চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বিবেচনা করেই ২৪ নম্বর ব্যাটালিয়নে তাঁকে পুনরায় নিয়োগ করা হচ্ছে। এই মানবিক ও সাহসিক সিদ্ধান্তের জন্য বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
কান্নার বদলে মুখে হাসি এবং কর্তব্যের ডাক
পূর্ণমের স্ত্রী রজনী সাউ আবেগঘন কণ্ঠে জানান, “যখন চাকরি চলে গিয়েছিল, তখন বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ি আর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম সংকটে পড়েছিলাম। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায়বিচারের আর্জি জানিয়েছিলাম। আজ সত্যি বিচার পেলাম।” বিচার পাওয়ার পর মুহূর্ত দেরি না করেই বৃহস্পতিবার পাঞ্জাবের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন পূর্ণম। ফের হাতে বন্দুক আর গায়ে বিএসএফের উর্দি জড়িয়ে দেশরক্ষার শপথ নিয়েছেন তিনি। রিষড়াবাসী আজ গর্বিত তাঁদের এই লড়াকু জওয়ানের জন্য, যিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আবারও সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হতে ছুটে গিয়েছেন।