অল্প বয়সে মা হওয়া কি ডেকে আনছে অকাল মৃত্যু, কিশোরী মায়েদের জন্য ৫টি চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি

কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকাল হলো একটি মেয়ের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সন্ধিক্ষণ। এই সময়ে শরীর যখন নিজেই পূর্ণতা পাওয়ার লড়াই চালায়, তখন গর্ভধারণের মতো গুরুভার বহন করা কেবল ঝুঁকিপূর্ণ নয় বরং জীবনঘাতী হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, ২০ বছর বয়সের আগে মা হওয়া একজন নারীর শরীরে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাল্যবিবাহ ও অসচেতনতার কারণে বিশ্বজুড়ে কিশোরী মায়েদের মৃত্যুর হার বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শরীর ও জীবনের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি
কিশোরী বয়সে সন্তানধারণ করলে একজন নারীকে প্রধানত পাঁচটি বড় ধরনের ঝুঁকির মোকাবিলা করতে হয়:
- প্রি-এক্লাম্পসিয়া ও উচ্চ রক্তচাপ: প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের তুলনায় কিশোরী মায়েদের গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বা ‘প্রি-এক্লাম্পসিয়া’ হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। এর ফলে মা ও শিশু উভয়েরই খিঁচুনি ও স্ট্রোক হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
- প্রসবকালীন জটিলতা: কিশোরীদের শ্রোণীচক্র বা কোমরের হাড় (Pelvis) পুরোপুরি বিকশিত হয় না। ফলে প্রসবের সময় শিশু বের হতে বাধা পায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘অবস্ট্রাক্টেড লেবার’ বলা হয়। এর থেকে জরায়ু ছিঁড়ে যাওয়া বা ‘ফিস্টুলা’-র মতো যন্ত্রণাদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি হতে পারে।
- মারাত্মক রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া: কৈশোরে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যই প্রচুর পুষ্টির প্রয়োজন। গর্ভধারণ করলে মা ও শিশু উভয়ের শরীরেই পুষ্টির তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়, যা থেকে মারাত্মক রক্তাল্পতা তৈরি হয়।
- অপরিপক্ক শিশু ও কম ওজন: কিশোরী মায়েদের ক্ষেত্রে সময়ের আগেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার (Preterm birth) প্রবণতা থাকে। এছাড়া শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হয়, যা নবজাতকের ভবিষ্যৎ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
- মানসিক অবসাদ ও বিষণ্ণতা: বয়সের অপরিপক্কতার কারণে সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই কিশোরীরা চরম ‘পোস্টপার্টম ডিপ্রেশন’ বা প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় ভোগে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
অকাল মাতৃত্ব কেবল স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, এটি একটি মেয়ের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারে ঠেলে দেয়। গর্ভধারণের ফলে অধিকাংশ কিশোরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ে। এতে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ক্ষতি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বার্তা
চিকিৎসকদের স্পষ্ট অভিমত, ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো মেয়েরই মা হওয়া উচিত নয়। একটি সুস্থ শিশু জন্ম দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো মায়ের শরীরের পূর্ণতা ও সুস্থতা। বাল্যবিবাহ রোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই অকাল মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব নয়। কিশোরীরা আগামীর ভবিষ্যৎ, তাই তাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এক ঝলকে
- বয়স সীমা: সুস্থ মাতৃত্বের জন্য অন্তত ২০ বছর বয়স হওয়া জরুরি।
- প্রধান ঝুঁকি: উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি, ফিস্টুলা এবং রক্তাল্পতা।
- নবজাতকের সমস্যা: কম ওজন এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া।
- সামাজিক ক্ষতি: শিক্ষা জীবন ব্যাহত হওয়া এবং অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা।
- মূল কারণ: বাল্যবিবাহ এবং সচেতনতার অভাব।