ঘুমের মধ্যে ভুল বকা কি পার্কিনসন্সের অশনি সংকেত? অজান্তেই বিপদ ডাকছেন না তো?

ঘুমের মধ্যে ভুল বকা কি পার্কিনসন্সের অশনি সংকেত? অজান্তেই বিপদ ডাকছেন না তো?

বার্ধক্যজনিত সাধারণ সমস্যা নাকি জটিল স্নায়বিক রোগ? অনেক সময় আমরা হাঁটাচলার ধীরগতি বা হাত কাঁপার মতো বিষয়গুলোকে বয়সের দোষ বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, এই লক্ষণগুলো হতে পারে ‘পার্কিনসন্স’ (Parkinson’s Disease)-এর সংকেত। মস্তিষ্কের ডোপামিন নামক রাসায়নিকের ঘাটতি থেকে তৈরি হওয়া এই রোগ সঠিক সময়ে শনাক্ত না করলে পঙ্গুত্বের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

পার্কিনসন্স আসলে কী এবং কেন হয়

পার্কিনসন্স মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ব্যাধি। মস্তিষ্কের ‘বেসাল গ্যাংলিয়া’ অংশে ডোপামিন তৈরির কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়া ও ভারসাম্য ব্যাহত হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই রোগের পেছনে মূল কারণ বার্ধক্য হলেও জিনগত ত্রুটি একটি বড় ভূমিকা পালন করে। এছাড়া অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বারবার মাথায় আঘাত বা মাইক্রো ট্রমা এবং রক্তের তারল্য কমে যাওয়াও এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকদের মতে, যারা ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোঁড়েন বা অসংলগ্ন কথা বলেন (RBD), ভবিষ্যতে তাদের পার্কিনসন্সে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সতর্ক থাকতে হবে যে লক্ষণগুলোতে

পার্কিনসন্স শনাক্ত করার জন্য চারটি প্রধান উপসর্গের দিকে নজর দেওয়া জরুরি:

  • কাজের গতি হ্রাস: স্নান করা, খাওয়া বা পোশাক পরার মতো দৈনন্দিন কাজে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগা।
  • বিশ্রামকালীন কম্পন (Rest Tremor): শরীর যখন স্থির থাকে বা বিশ্রাম নেয়, তখন হাত-পা কাঁপা। তবে কোনো কাজ করার সময় বা লেখার সময় হাত কাঁপা সাধারণত এই রোগের লক্ষণ নয়।
  • হাঁটাচলার পরিবর্তন: স্বাভাবিক হাঁটার ছন্দ হারিয়ে ফেলা এবং সামনের দিকে ঝুঁকে ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে যাওয়ার মতো ভঙ্গি করা।
  • মুখের অভিব্যক্তি কমে যাওয়া: একে বলা হয় ‘মাস্কড ফেস’। আবেগ বা প্রতিক্রিয়ার ছাপ রোগীর মুখে স্পষ্ট হয় না। এছাড়া কথা জড়িয়ে যাওয়া ও ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়াও অন্যতম লক্ষণ।

প্রতিকার ও জীবনযাত্রা

পার্কিনসন্স রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তবে সঠিক চিকিৎসায় একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত ওষুধ সেবন, ফিজিওথেরাপি এবং নিউরো-রিহ্যাবিলিটেশন রোগীকে প্রায় স্বাভাবিক জীবন দিতে পারে। রোগের চরম পর্যায়ে মস্তিষ্কে পেসমেকারের মতো যন্ত্র বসিয়েও চিকিৎসা করা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, ওষুধের পাশাপাশি রোগীর মানসিক সুস্থতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ও সহমর্মিতা রোগীর আত্মবিশ্বাস বজায় রাখতে সাহায্য করে। গান শোনা, ছবি আঁকা বা লেখালেখির মতো সৃজনশীল কাজে মস্তিষ্ককে সচল রাখলে রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব।

একঝলকে

  • মূল কারণ: মস্তিষ্কে ডোপামিন কমে যাওয়া এবং স্নায়বিক বিকলতা।
  • প্রধান উপসর্গ: শরীরের ধীরগতি, হাত কাঁপা, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং অভিব্যক্তিশূন্য মুখ।
  • ঝুঁকির কারণ: বার্ধক্য, বংশগতি, মানসিক চাপ এবং ঘুমের অস্বাভাবিক অভ্যাস।
  • সমাধান: বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ, সঠিক ব্যায়াম এবং ইতিবাচক জীবনযাপন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *