নিয়মিত রাত্রি জাগরণের স্বাস্থ্যঝুঁকি- ১ঝলক

নিয়মিত রাত্রি জাগরণের স্বাস্থ্যঝুঁকি- ১ঝলক

ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি মোদের বাড়ি এসো/ খাট নেই পালঙ্ক নেই খোকার চোখে বসো। যুগ পাল্টে গেছে। স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ এমন নানা প্রযুক্তিপণ্যের সহজলভ্যতা, শ-খানেক টিভি চ্যানেল আর ফেসবুক-বিপ্লবের ঝড়ে ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসিরা বহু আগেই প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। না পালিয়ে উপায় কী? ঘুমতাড়ানি ডিজিটাল দৈত্যদের আগ্রাসনে ওদেরই যে চিরতরে ঘুম হারানোর দশা!

নিয়মিত রাত্রি জাগরণের স্বাস্থ্যঝুঁকি- ১ঝলক

আপনি হয়তো রাতের পর রাত জেগে টিভিতে টক শো কিংবা মুভি-সিরিয়াল দেখছেন, নয়তো একটু পর পর দেখে চলেছেন আপনার ফেসবুক স্ট্যাটাসে কয়টা লাইক পড়ল। নিশ্চিত জেনে রাখুন, প্রতিরাতে আপনি নীরবে ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছেন মনোদৈহিক স্বাস্থ্যদুর্ভোগের ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হঠাৎ দু-একদিন জরুরি প্রয়োজনে রাত জাগতে হতেই পারে। কিন্তু ক্রমাগত রাতজাগার ফলে একজন মানুষের দেহঘড়িতে দেখা দিতে পারে মারাত্মক গোলযোগ। যার পরিণতিতে তিনি আক্রান্ত হন স্লিপ ডিজঅর্ডার, অপরিণত বয়সে হৃদরোগ, বিষণ্নতা এমনকি পারিবারিক অশান্তিতে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মধারাকেও শ্লথ করে তোলে টানা রাত্রি জাগরণ। সৃজনশীলতা, প্রাণবন্ততা, কর্মতৎপরতা কমে যায় এতে। অন্যদিকে স্বাভাবিক জৈব-ছন্দ অনুসারে প্রতিদিন পরিমিত ঘুম ও বিশ্রাম হলে স্মৃতিশক্তি হয়ে ওঠে সংহত এবং তা প্রয়োজনের সময় কাজও করে ভালোভাবে।

প্রত্যেক মানুষের শরীরেই আছে একটি প্রাকৃতিক জৈবঘড়ি, যা নিয়ন্ত্রণ করে হরমোন প্রবাহসহ আমাদের যাবতীয় শারীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড। তার কথা হলো, দিনে কাজ করো, আর রাতটা রেখো তৃপ্তিময় সুনিদ্রার জন্যে। কিন্তু আপনি যখন দিনের পর দিন এই স্বাভাবিক জৈব-ছন্দকে প্রভাবিত করেন, দেহঘড়িতে বাধে গোলমাল। ফলে জ্বর জ্বর ভাব, ঠান্ডা লাগা, এসিডিটি-র পাশাপাশি দুর্বল হতে থাকে আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

মানবদেহের বিভিন্ন হরমোন ও এনজাইমগুলোর মাত্রা সকাল-সন্ধ্যা ভেদে তারতম্য ঘটে। যেমন : কর্টিসোল। মানবদেহের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী এ হরমোনটির নিঃসরণ-মাত্রা দিনের প্রথমার্ধে থাকে সর্বোচ্চ পরিমাণে এবং এরপর থেকে কমতে থাকে। কিন্তু টানা রাত্রি জাগরণের ফলে এই প্রাকৃতিক নিয়ম পাল্টে যায়। বিঘ্নিত হয় স্বাভাবিক হরমোন প্রবাহ।

গবেষকরা বলছেন, কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, ক্রমাগত রাত জেগে তার কোনো সমস্যাই হচ্ছে না, ভালোই সয়ে গেছে। এ-ক্ষেত্রে গবেষকদের ভাষ্য হলো, যারা অ্যালকোহলিক তারাও এই যুক্তিই দেন—‘আমার তো কোনো সমস্যা হয় না, বরং কিছুটা পান করলেই আমি বেশ চনমনে থাকি আর আমি মাতালও হই না।’ কিন্তু ক্ষতি যেদিকে যা হওয়ার ঠিকই হয়, যা-ই তারা বলুক।

রাতে নিয়মিত ঘুম পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে দেহের ওজন থাকে নিয়ন্ত্রণে। যোগশাস্ত্র অনুসারে, সূর্যের গতিবিধি পরিপাকতন্ত্রের কর্মপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। মানব পরিপাকতন্ত্র সবচেয়ে ভালো কাজ করে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মধ্যবর্তী সময়ে। রাত বাড়ার সাথে সাথে ক্রমশ কমতে থাকে খাবার হজমে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন এনজাইম নিঃসরণের পরিমাণ।

ফলে আমরা যখন রাত জাগি ও রাতের খাবারটা খাই দেরি করে, ওটা ভালো হজম হয় না। এজন্যে প্রায়শই রাত জাগেন যারা, হজমযন্ত্রের গোলমাল তাদের একটি সাধারণ সমস্যা। অন্যদিকে রাতে শীঘ্র খাবার গ্রহণ ও পরিমিত ঘুম পরিপাকতন্ত্রকে রাখে সুস্থ এবং ওজনও থাকে নিয়ন্ত্রণে।

এসব তথ্য বিবেচনায় স্বাস্থ্যগবেষকরা বলছেন, ছন্দময় মনোদৈহিক সুস্বাস্থ্য এবং গতিময় কর্মব্যস্ত জীবনের জন্যে প্রতিরাতে পরিমিত ঘুমান। তাতে আপনি সারাদিনই থাকবেন কর্মতৎপর চটপটে সৃজনশীল ও তীক্ষ্ন স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তথ্যসূত্র: হেলথ এন্ড নিউট্রিশন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *