একটি অমর ফল: রাজা ভর্তৃহরির সংসার ত্যাগের আসল রহস্য কী?

একটি অমর ফল: রাজা ভর্তৃহরির সংসার ত্যাগের আসল রহস্য কী?

প্রাচীন ভারতীয় পুরাণে কামদেব বা মন্মথকে মনের চঞ্চলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। পুরাণ মতে, মহাদেবের তৃতীয় নেত্রর দহনে ভস্মীভূত হয়েও তিনি ‘অশরীরী’ রূপে মানুষের হৃদয়ে বিদ্যমান। কবিরা তার হাতে দিয়েছেন আখের ধনুক আর পঞ্চপুষ্পের বাণ, যা মানুষের মনের গহীনে কামনার উদ্রেক করে। কিন্তু এই কামনার মায়া কীভাবে একজন ভোগী রাজাকে পরম যোগীতে পরিণত করতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ রাজা ভর্তৃহরির জীবনকাহিনি।

মন্মথর পঞ্চবাণ ও শরীরতত্ত্বের বিশ্লেষণ

ভারতীয় সাহিত্যে কামকে কেবল জৈবিক চাহিদা হিসেবে নয়, বরং একটি শৈল্পিক ও বৈজ্ঞানিক পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মন্মথর পাঁচটি তীরের (অরবিন্দ, অশোক, নীলোৎপল, আম্রমঞ্জরী ও নবমল্লিকা) প্রতিটি মানুষের শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তনের সংকেত দেয়:

  • অরবিন্দ: চোখের মাধ্যমে রূপের আকর্ষণ।
  • অশোক: সেই আকর্ষণ থেকে মনে প্রফুল্লতা আসা।
  • নীলোৎপল: হৃদয়ে সুপ্ত বাসনার অঙ্কুরোদগম।
  • আম্রমঞ্জরী (চুতম): শরীরের রসদায়ক ও শারীরিক পরিবর্তনের সূচনা।
  • নবমল্লিকা: কামনার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছানো।

একটি মায়াবী ফল এবং ভর্তৃহরির বৈরাগ্য

সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম প্রবাদপুরুষ রাজা ভর্তৃহরি ছিলেন একাধারে সুশাসক ও রসিদ পণ্ডিত। তবে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় একটি অলৌকিক ফল। লোককথা অনুযায়ী, এক সাধু রাজাকে একটি বিশেষ ফল উপহার দিয়ে জানান, এটি খেলে তিনি অমরত্ব ও দীর্ঘ যৌবন লাভ করবেন। নিজের চেয়েও প্রিয়তমা রানিকে বেশি ভালোবাসতেন বলে রাজা ফলটি তাকে দিয়ে দেন।

কিন্তু শুরু হয় এক বিচিত্র ঘটনার পরিক্রমা। রানি সেই ফলটি রাজাকে না খেয়ে তার গোপন প্রেমিক অশ্বশালার রক্ষককে উপহার দেন। সেই রক্ষক আবার ফলটি দিয়ে দেন এক পরিচারিকাকে, যাকে সে ভালোবাসত। কাকতালীয়ভাবে, সেই পরিচারিকার সঙ্গে রাজার সখ্য ছিল এবং তিনি রাজার দীর্ঘায়ু কামনায় ফলটি পুনরায় রাজাকেই উপহার দেন।

বিশ্বাসের অকালমৃত্যু ও অমর কাব্য সৃষ্টি

নিজের দেওয়া ফল ঘুরেফিরে নিজের কাছেই ফিরে আসায় ভর্তৃহরি স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন, যাকে তিনি হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন, তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। এই মোহভঙ্গ তাকে এক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তিনি উপলব্ধি করেন, এই জগত কাম ও মোহের এক জটিল মায়াজাল মাত্র। এই তীব্র বিতৃষ্ণা থেকেই তিনি রাজ্য ও বিলাসিতা ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তার এই জীবনবোধ থেকেই জন্ম নেয় অমর সৃষ্টি ‘নীতি শতকম’, ‘শৃঙ্গার শতকম’ এবং ‘বৈরাগ্য শতকম’।

একঝলকে

  • মন্মথর স্বরূপ: মনকে মন্থনকারী বা চঞ্চলকারী অবস্থাই হলো মন্মথ।
  • বৈজ্ঞানিক রূপক: কামদেবের পাঁচটি পুষ্পবাণ আসলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক উদ্দীপনার পাঁচটি পর্যায়।
  • ভর্তৃহরির রূপান্তর: বিশ্বাসের অমর্যাদা ও ভালোবাসার প্রতারণা একজন রাজাকে যোগীতে রূপান্তরিত করে।
  • শিক্ষণীয়: মানুষের মন ছোট হলেও তার বাসনা অসীম, যা নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৃত বীরত্ব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *