সিঙ্গুরে শিল্পের দাবি না কি কৃষিতেই ভরসা, আন্দোলনের ১৫ বছর পর ভোটপ্রাক্কালে কী বলছেন কৃষকরা

সিঙ্গুরের ঐতিহাসিক জমি আন্দোলনের দেড় দশক অতিক্রান্ত। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিল, যার জেরে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের মুখে সিঙ্গুরের উর্বর জমিতে এখন রাজনীতির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও কৃষির ভারসাম্য। একদা টাটা ন্যানো প্রকল্পের বিরোধিতায় সরব হওয়া সিঙ্গুরবাসী আজ স্পষ্ট জানাচ্ছেন, তাঁরা শিল্পের বিরোধী নন, তবে উর্বর কৃষিজমি রক্ষাই তাঁদের প্রথম শর্ত।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, বহুফসলি ও উর্বর জমিতে কোনোভাবেই কারখানা করা চলবে না। এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ জমি অনুর্বর হওয়ার দাবি তুলে তাঁরা জানাচ্ছেন, সেই সমস্ত জমিতে শিল্প হলে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। প্রসেনজিৎ দাস বা শ্রীকান্ত মান্নার মতো ভূমিপুত্রদের কথায়, “আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু চাষের জমি বিসর্জন দিয়ে নয়।” বর্তমান শাসকদলের প্রার্থী বেচারাম মান্নাও সুর মিলিয়ে দাবি করেছেন যে, তাঁদের আন্দোলন কখনোই শিল্পের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং তা ছিল জোরপূর্বক উর্বর জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের ইস্যুটিকে হাতিয়ার করছে বিরোধীরাও। বিজেপি প্রার্থী অরূপ কুমার দাসের প্রতিশ্রুতি, তাঁরা ক্ষমতায় এলে সিঙ্গুরে শিল্পের পরিবেশ তৈরি করবেন যাতে ঘরের ছেলেদের কাজের জন্য বাইরে যেতে না হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতির পাশাপাশি অনুর্বর জমিতে কলকারখানা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চাইছেন তিনি। সিঙ্গুরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—উন্নতমানের সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল ও কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় স্থাপন, যা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে অন্যতম তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সিঙ্গুর আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পৈতৃক কৃষিজমি আগলে রাখার আবেগ, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের জন্য আধুনিক কর্মসংস্থানের চাহিদা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনই এবারের নির্বাচনে সিঙ্গুরের মূল সুর। ভোটারদের স্পষ্ট বার্তা, যে পক্ষ কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে উর্বর জমি রক্ষা করে উন্নয়নের দিশা দেখাবে, তাঁদের ভাগ্যবিধাতা হওয়ার সুযোগ দেবে সিঙ্গুর। ১৫ বছর আগের সেই আন্দোলনের তেজ আজও ফিকে হয়নি, বরং তা নতুন দাবি ও প্রত্যাশায় মোড় নিয়েছে।