৫ শতাংশের ম্যাজিকেই কেল্লাফতে, দুই দশকের রেকর্ড ভেঙে বাংলায় গেরুয়া সূর্যোদয়

৫ শতাংশের ম্যাজিকেই কেল্লাফতে, দুই দশকের রেকর্ড ভেঙে বাংলায় গেরুয়া সূর্যোদয়

কলকাতা: মে মাসের তপ্ত দুপুরে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে ঘটে গেল ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে ভারতীয় জনতা পার্টি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সেই ভবিষ্যদ্বাণীই যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল; উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল— একাধিক জেলায় আক্ষরিক অর্থেই ‘খাতা খুলতে’ পারল না তৃণমূল কংগ্রেস। শতাংশের হিসেবে মাত্র ৫ শতাংশ ভোটের ব্যবধানই রাজ্যের মসনদ থেকে সরিয়ে দিল ঘাসফুল শিবিরকে।

শুভেন্দুর সেই ৫ শতাংশ ও মেরুকরণের সমীকরণ

নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে শুভেন্দু অধিকারী বারবার দাবি করেছিলেন, মাত্র ৫ শতাংশ অতিরিক্ত ভোট পেলেই বাংলার সরকার পরিবর্তন নিশ্চিত। ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ২০২১ সালের ৩৮.১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশে। অন্যদিকে, তৃণমূলের ভোট প্রায় ৭ শতাংশ কমে ঠেকেছে ৪১ শতাংশে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের এই হারানো ভোটের সিংহভাগ সরাসরি বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর থেকে পশ্চিম বর্ধমান— সর্বত্রই এই সমীকরণ কাজ করেছে। শুভেন্দু অধিকারীর ভাষায়, এই জয় মূলত নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের সংহতি এবং শাসকদলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন।

পালাবদলের নেপথ্যে যে কারণসমূহ

২০২৬-এর এই পালাবদলকে রাজনৈতিক পণ্ডিতরা একগুচ্ছ কারণের সমষ্টি হিসেবে দেখছেন। প্রথমত, এবারের নির্বাচনে ৯৩ শতাংশের রেকর্ড ভোটদান কার্যত পরিবর্তনের পক্ষেই গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ‘SIR’ বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারিতে ‘ছাপ্পা’ ভোট বন্ধ হওয়াকে বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এছাড়া, গত ১৫ বছরের কর্মসংস্থানহীনতা, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। এমনকি, মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও ভোট ভাগ হওয়ায় বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ম্যাজিক।

কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার বা ‘ডাবল ইঞ্জিন’ তত্ত্বের ওপর ভরসা রেখেই বাংলার ভোটাররা এবার পরিবর্তনের বোতাম টিপেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের স্মৃতিকেই উসকে দিল। সব মিলিয়ে, ‘ঘরের মেয়ে’র স্লোগানকে ছাপিয়ে বাংলার তখতে এখন নতুন ভোরের অপেক্ষায় গেরুয়া শিবির।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *